কাল ভোট, থাকছে শঙ্কাও

জনকাঙ্খিত ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। এ নির্বাচনের ভোট আগামীকাল বৃহস্পতিবার। ওইদিন সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে একযোগে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ব্যাপক উৎসাহ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশের মধ্যদিয়ে গতকাল সকাল সাড়ে ৭টায় শেষ হয়েছে প্রচার-প্রচারণা। এখন শুধু অপেক্ষা ভোটের। কাজেই অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য ভোট সম্পন্ন করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে ভোটকে ঘীরে জনমনে রয়েছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাও।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনে ৫০টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে এবং মোট প্রার্থী সংখ্যা ২ হাজার ২৮ জন। এর মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৫ জন। সবচেয়ে বেশি ২৯১ জন প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। এছাড়া, ঢাকা-১২ আসনে সর্বোচ্চ ১৫ জন এবং পিরোজপুর-১ আসনে সর্বনিম্ন ২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সারাদেশের ৩০০ সংসদীয় আসনে ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রের ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২টি কক্ষে ভোটগ্রহণ করা হবে। এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৯ জন। এর মধ্যে ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫৪ জন পুরুষ এবং ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৫ জন নারী ভোটার রয়েছেন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১ হাজার ২২০ জন।
ইসি সূত্রে আরো জানা যায়, ১২৪টি দেশে পোস্টাল ব্যালট পাঠানো হয়েছিল। পোস্টাল ভোটের মাধ্যমে ভোটদানে মোট ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৪ জন ভোটার নিবন্ধন করেছেন। এর মধ্যে প্রবাসী ভোটার ৭ লাখ ৭২ হাজার ৫৪৬ জন এবং দেশের অভ্যন্তরে আইসিপিভি ভোটার ৭ লাখ ৬১ হাজার ১৩৮ জন। ইতোমধ্যে ৪ লাখ ৮০ হাজার ৪১৬ জন প্রবাসী ভোটার ভোটদান সম্পন্ন করেছেন বলে ইসি জানিয়েছে।
এদিকে, গত ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন দেশের কারাবন্দিরা। কারা সূত্রে জানা গেছে, দেশের ৭৫টি কারাগারে থাকা মোট ৮৬ হাজার ৩০০ বন্দির মধ্যে ৬ হাজার ২৪০ জন পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেন। এর মধ্যে নির্বাচন কমিশন অনুমোদন দিয়েছে ৫ হাজার ৯২০ জনকে। অনুমোদিতদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ৪ হাজার ৬৭ জনের ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি বন্দিদের ভোট গ্রহণ শেষ করে ব্যালটগুলো নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ে পাঠানো হবে বলে কারা সূত্র জানিয়েছে।
পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি : পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে পাবনা-৫ আসনে (সদর) ভোট দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। সোমবার বঙ্গভবনে তিনি এ ভোট দেন বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপ্রধানের সহকারী একান্ত সচিব মোহাম্মদ সাগর হোসেন। নতুন পদ্ধতিতে ইতোমধ্যে কারাগার থেকে ভোট দিয়েছেন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী, এমপি, আমলা, পুলিশ, সাংবাদিকসহ ২০ জন।
কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন জানান, সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, আমলা ও সাংবাদিকদের মধ্যে ৪০ জন ভোট দিতে নিবন্ধন করেছিলেন। ‘এই ৪০ জনের মধ্যে ২০ জন এখন ভোট দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন। বাকিরা নিয়ম অনুযায়ী ভোট দিয়েছেন।
আইন-শৃঙ্খলা: নির্বাচনের আগে ও পরে মোট সাত দিন সেনাবাহিনী মাঠে থাকবে, আট দিন আনসার বাহিনী দায়িত্ব পালন করবে। পুলিশ ইতোমধ্যেই মাঠে রয়েছে এবং সেনাবাহিনীও মোতায়েন রয়েছে। নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে প্রায় ৮ লাখ কর্মকর্তা নিয়োজিত থাকছেন। এর পাশাপাশি প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য নির্বাচন ও গণভোটে নিরাপত্তা দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে ১ হাজার ৫০ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোতায়েন করা হচ্ছে, যারা ৮ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাঠে থাকবেন। মূলত মোবাইল কোর্ট পরিচালনার দায়িত্বে থাকছেন তারা। বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটদেরও ৮ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সাতদিন মাঠে থাকার কথা রয়েছে।
পর্যবেক্ষক প্রসঙ্গে ইসি জানায়, ৮১টি দেশি নিবন্ধিত সংস্থার ৫৫ হাজার ৪৫৪ জন পর্যবেক্ষক দায়িত্ব পালন করবেন। এদের মধ্যে ৭ হাজার ৯৯৭ জন কেন্দ্রীয় পর্যায়ে এবং ৪৭ হাজার ৪৫৭ জন স্থানীয়ভাবে পর্যবেক্ষণে থাকবেন। এছাড়া প্রায় ৫৪০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষকও নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবেন।
ভোটের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ থাকছে ১ হাজার ড্রোন : ভোটের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে সারা দেশের ভোটকেন্দ্রে থাকছে ১ হাজার ড্রোন। নির্বাচনি সহিংসতা রোধে এবং দুর্গম জনপদে কড়া নজরদারি নিশ্চিত করতে এমন নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিয়েছে ইসি। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প, পার্বত্য অঞ্চল এবং সীমান্তবর্তী টেকনাফ থেকে ফেনী পর্যন্ত এই বিশেষ নজরদারি করা হবে।
এ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মোহাম্মদ সানাউল্লাহ বলেন, বিমান বাহিনীর কারিগরি সহায়তায় এই ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। তিনি বলেন, এই ড্রোনগুলো ‘স্যাটেলাইট’ বা উপগ্রহের মতো কাজ করবে, যা সরাসরি প্রধান নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে স্থাপিত কেন্দ্রীয় সমন্বয় সেলে রিয়েল টাইম তথ্য ও ভিডিও পাঠাবে।
ইসির সূত্রগুলো জানিয়েছে, সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিতে কেবল প্রযুক্তি নয়, মাঠে সক্রিয় থাকবে ডিজিএফআই, এনএসআই, র্যাব ও বিজিবিসহ মোট ২১টি আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা সংস্থা। ড্রোনের মাধ্যমে কোনো ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা, অস্ত্র প্রদর্শন বা গোপন তৎপরতা নজরে এলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেবে এই বাহিনীগুলো। পুরো প্রক্রিয়া সমন্বিতভাবে পরিচালনার জন্য ব্যবহার করা হবে বিশেষায়িত ‘ই-মনিটরিং’ অ্যাপ।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সূত্রে জানা গেছে, পুলিশকে বডি ওর্ন ক্যামেরা দেওয়া হয়েছে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট অনুষ্ঠানের স্বার্থে সারাদেশে ২৫ হাজার সাতশ’ বডি ওর্ন ক্যামেরা দেওয়া হচ্ছে।
দুই ঘণ্টা পরপর কাস্টিং ভোটের হার জানাবে ইসি : ভোট গ্রহণ চলাকালে কাস্টিং ভোটের হার দুই ঘণ্টা পরপর জানানো হবে। নির্বাচন কমিশন এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করেছে। ইসির সিনিয়র সহকারী সচিব মো. শহীদুল ইসলাম এমন নির্দেশনা পাঠিয়েছেন। নির্দেশনা অনুযায়ী, ভোট কেন্দ্রভিত্তিক প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা নির্ধারিত সময় অন্তর সংগ্রহ ও যাচাই করে ইসি নির্ধারিত ডিজিটাল সিস্টেমে আপলোড করা হবে, যা কমিশন পর্যায়ে তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাবে। এতে বলা হয়েছে, দুই ঘণ্টা অন্তর অন্তর ভোট কেন্দ্রভিত্তিক প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা প্রেরণ করতে হবে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণের জন্য কমিশনের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। এখন ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা ছাড়া আর কোনো প্রস্তুতি বাকি নেই। তিনি বলেন, নির্বাচনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই সর্বোচ্চ সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ভোট নিয়ে কোনো ধরনের শঙ্কার কারণ নেই। ভোটারদের নির্ভয়ে কেন্দ্রে এসে ভোটাধিকার প্রয়োগের আহ্বান জানান তিনি।
ইসি সচিব বলেন, আমাদের ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। এ পর্যন্ত ২৯৯টি আসনের সব ব্যালট পেপার চলে গেছে। সব নির্বাচনি উপকরণও চলে যাচ্ছে। ব্যালট পেপার রিটার্নিং অফিসারের কাজ কার্যালয় থেকে পর্যাক্রমিকভাবে অ্যাসিস্টেন্ট রিটার্নিং অফিসার এবং প্রিজাইডিং অফিসারদের কাছ থেকে চলে যাচ্ছে। এখন আমাদের নির্বাচনের মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য অপেক্ষা।
নিষেধাজ্ঞা আরোপ: এদিকে নির্বাচনকে প্রভাবমুক্ত, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ রাখতে গতকাল ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত নির্বাচনী এলাকায় বহিরাগতদের অবস্থানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ইসি। এ সময় সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দা বা ভোটার ছাড়া অন্য কেউ সেখানে অবস্থান করতে পারবেন না। পাশাপাশি গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ৭৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত সব ধরনের জনসভা, মিছিল বা শোভাযাত্রার ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
প্রার্থী ও এজেন্টরা ব্যবহার করতে পারবেন একটি করে গাড়ি : জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে ভোট গ্রহণের দিন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও তাঁদের নির্বাচনি এজেন্টদের চলাচলের ক্ষেত্রে যানবাহন ব্যবহারে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ ক্ষেত্রে প্রার্থী ও তাঁর প্রতিটি এজেন্ট প্রত্যেকে একটি করে গাড়ি ব্যবহার করতে পারবেন এবং সঙ্গে সর্বোচ্চ পাঁচজনকে নিয়ে চলাচল করতে পারবেন বলে জানিয়েছে ইসি। ইতোমধ্যে সব রিটার্নিং কর্মকর্তাকে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইসির সিনিয়র সহকারী সচিব স্বাক্ষরিত এ-সংক্রান্ত চিঠি থেকে এসব তথ্য জানা যায়।
নির্দেশনায় বলা হয়, যেসব এলাকায় মোটরসাইকেল ছাড়া অন্য কোনো যানবাহন চলাচল সম্ভব না, সে ক্ষেত্রে প্রার্থী নিজে ও তাঁর নির্বাচনি এজেন্ট প্রত্যেকে দুটি করে মোটরসাইকেল ব্যবহার করতে পারবেন। প্রতিটি মোটরসাইকেলে চালকসহ (বৈধ লাইসেন্সধারী) অনধিক দুজন করে থাকতে পারবেন। রিটার্নিং অফিসার কর্তৃক প্রদত্ত স্টিকার গাড়িতে প্রদর্শন করতে হবে। প্রার্থী তাঁর নিরাপত্তার জন্য গানম্যান নিয়োগ করে থাকলে গানম্যানও পাঁচজনের অন্তর্ভুক্ত হবেন। প্রার্থী নির্বাচনি এজেন্ট ব্যতীত তাঁদের সঙ্গে থাকা অন্য কেউ ভোট কেন্দ্রের চৌহদ্দির মধ্যে প্রবেশ করতে পারবে না।
ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র ১৬ হাজার : পুলিশের তথ্যানুযায়ী, এবারের নির্বাচনে সারা দেশে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র ১৬ হাজার ৩৫৯টি। ঝুঁকি নেই, এমন ভোটকেন্দ্র (সাধারণ) ১৭ হাজার ৬৫৬। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা পরিপত্র অনুযায়ী, এবার মহানগর এলাকার বাইরে সারা দেশে প্রতিটি সাধারণ ভোটকেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১৬ থেকে ১৭ জন সদস্য এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ১৭ থেকে ১৮ জন মোতায়েন থাকছে। আর মহানগর এলাকার সাধারণ ভোটকেন্দ্রে ১৬ জন ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ১৭ জন থাকছে। দুর্গমঘোষিত ২৫ জেলার নির্দিষ্ট এলাকার ভোটকেন্দ্রে ১৬ থেকে ১৮ জন করে সদস্য মোতায়েন থাকছে।
সারা দেশে ৮ হাজার ৭৭০টি ভোটকেন্দ্র অতি ঝুঁকিপূর্ণ: সারা দেশে ৮ হাজার ৭৭০টি ভোটকেন্দ্র অতি ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানিয়েছেন পুলিশের পরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম। তিনি বলেছেন, এসব কেন্দ্রে বডি ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। এ ছাড়া ড্রোন ব্যবহার করা হবে।
থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের বিষয়ে বাহারুল আলম বলেন, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে করার লক্ষ্যে বৈধ অস্ত্রের বিষয়ে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে বৈধ ২৭ হাজার ৯৯৫টি অস্ত্র জমা নেওয়া হয়েছে। শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখরভাবে যেন ভোটগ্রহণ হয়, সেজন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
আইজিপি আরও বলেন, এবার নির্বাচনে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩ জন পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা তিন ধরনের হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এবার নিরাপত্তার রক্ষার্থে প্রযুক্তির ব্যবহারে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ৯০ ভাগ কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। ভোট কেন্দ্র, ভ্রাম্যমাণ ও স্ট্রাইকিং ফোর্স-এই তিনটি স্তরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
প্রত্যাশার ভোটে সঙ্গী শঙ্ক: ভোট গ্রহণের সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে ভয় ও শঙ্কা। এই ভয়-শঙ্কা ভর করেছে খোদ সরকারের ভিতর ও বাইরে। এজন্য বহুলপ্রত্যাশার এ ভোট নিয়ে চরম অস্বস্তিতে রয়েছেন সাধারণ ভোটাররা। তারা বলছেন, উৎসবের ভোটে যেন কোনোভাবেই নিরাপত্তার ঘাটতি না হয়। সরকারের উচিত হবে তা নিশ্চিত করা। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন, কেন্দ্রীয় প্রশাসন, জেলা প্রশাসন এবং পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ে একটি গ্রুপ সরকারকে সহযোগিতা করছে না, এমন অভিযোগ খোদ সরকারেরই। যার ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের ভিতরেও নির্বাচনি নিরাপত্তা নিয়ে ভয় ও শঙ্কা জেঁকে বসেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কার্যালয় এবং নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে পুরো ঢাকার ২০টি আসনের প্রতিটি এলাকাই ঝুঁকিপূর্ণ। তবে ঢাকার ভিতরে ৮, ১২, ১৭, ১৮ আসনকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছে ইসি। এ ছাড়া ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, গোপালগঞ্জ, মাদারীরপুর, ফরিদপুর, নরসিংদী ও কুমিল্লায় থাকবে বিশেষ নজরদারি। স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ বিভাগের একাংশের অসহযোগিতায় অস্বস্তিতে রয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এর সঙ্গে যোগ হয়েছেন প্রশাসনের ভিতরে থাকা আওয়ামী লীগপন্থি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। শুধু তা-ই নয়, সরকারি চাকরিজীবী যারা নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের জন্য আন্দোলন করছেন তারাও যুক্ত হয়েছেন সরকারকে অসহযোগিতাকারীদের দলে।
সূত্র জানায়, দেশজুড়ে যেন সহিংসতা না হয় সেজন্য সারা দেশে ১ লাখ সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। একই সঙ্গে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের জন্য ভোটের আগেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত জরুরি বলে জানিয়েছেন সেনা সদরের সামরিক অপরেশন্স পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন। সে লক্ষ্যেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যসংখ্যা ধাপে ধাপে বাড়িয়ে বর্তমানে এক লাখে উন্নীত করা হয়েছে।
তাঁর দেওয়া তথ্যমতে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৬২ জেলায়, ৪১১টি উপজেলায় এবং বিভিন্ন মেট্রোপলিটন শহরে ৫৪৪টি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করেছে। এসব ক্যাম্প থেকে নিয়মিত টহল, যৌথ অভিযান, চেকপোস্ট পরিচালনা এবং অস্ত্র উদ্ধার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
সরকারের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, দেশজুড়ে সহিংসতার ঘটনা বেশি ঘটলে বিলম্বিত হতে পারে ফলাফল ঘোষণা। সেই প্রস্তুতিও নিয়ে রাখতে বলা হয়েছে। এজন্য ওই অতিরিক্ত সময়ে দেশে যেন কোনো রকম বিশৃঙ্খলা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি না ঘটে বা প্রাণহানির মতো নৃশংস ঘটনা না ঘটে, সেজন্য সেনাবাহিনীকে সজাগ থাকতে বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পুলিশ বা সরকারের স্থানীয় বা কেন্দ্রীয় প্রশাসনের প্রতিও কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে সরকারের ভিতরে এবং প্রশাসন ও পুলিশের ভিতরে একটি অংশ নির্বাচন নিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে বলে বিভিন্ন গোয়েন্দার খবরে বলা হয়েছে। যা প্রধান উপদেষ্টা, নির্বাচন কমিশন ও সেনা সদর দপ্তরকে অবহিত করা হয়েছে।
এদিকে বিএনপি ও জামায়াতের চাপ রয়েছে ভোটের দিনই দ্রুত ফলাফল ঘোষণা করতে হবে। সে চাপের কথা মাথায় রেখে ভোটের দিনই ফলাফল ঘোষণার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে ইসি। তবে যদি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে তবে সেটার ব্যতিক্রম ঘটতে পারে। নির্বাচন কমিশন ও সরকারের তরফ থেকে এ প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে।
এ বিষয়ে এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও বরিশাল-৩ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেছেন, ভোটাররা ভয়ের ভেতরে আছে, শঙ্কায় আছে, সারা দেশের একই চিত্র। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর হলে এখনও পরিস্থিতি পাল্টাতে পারে।
ব্যারিস্টার ফুয়াদ বলেন, এই নির্বাচনে কী হবে, সেই পরিসংখ্যান কারও কাছে নেই। জরিপে যা বলা হচ্ছে, তা তখনই বোঝা যাবে, যখন ভোটাররা নিরাপদে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবে। প্রশাসন এখনও মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচন কমিশন যে ঈদের আনন্দ দেখছে, বাস্তবে তা নেই। ভোটারদের ভয় আছে। শঙ্কার এই পরিবেশ সারাদেশে—এমনটা দাবি করেন তিনি।
ভোরের আকাশ/এসএইচ