জাতীয় সংসদ নির্বাচন
ভোটের ফ্যাক্টর ‘৭১’

আর মাত্র ১৩ দিন পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ও জামায়াতে ইসলামী জোটসহ ৫১টি দল। দলগুলোর এবং স্বতন্ত্র মিলিয়ে ভোট যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন প্রায় দুই হাজার প্রার্থী। ভোটের মাঠে জয় পেতে পুরোদমে প্রচার-প্রচারণায় রয়েছেন প্রার্থীরা। একাত্তরকে রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি ধরে গত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী কর্মকাণ্ড মাথায় রেখে ২৪ জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভোটের মাঠে প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থীরা। অন্যদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে সামনে রেখে ভোটের মাঠে প্রচারণায় রয়েছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থীরা। ভোটের মাঠে জুলাই অভ্যুত্থানের পাশাপাশি ধর্মীয় অনুভূতিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে একটি জোট- যা ফুটে উঠেছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টিতে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান ভিত্তি, যা দলীয় মতাদর্শ, জাতীয় পরিচয় এবং রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণের প্রধান ফ্যাক্টর। তাদের মতে, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠে রাজনৈতিক আদর্শ। এরই মধ্যে নিহিত বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ও ভোটারদের আবেগ। ভোটের রাজনীতিতে ৭১’কে উপেক্ষা করার কোন সুযোগ নেই। কাজেই ভোটের মাঠে জয়-পরাজয়ে একাত্তরই ফ্যাক্টর বলছেন তারা।
বিশিষ্টজনদের মতে, আওয়ামী লীগ যেহেতু ভোটের মাঠে নেই, সেক্ষেত্রে ভোটের মাঠে এগিয়ে থাকবে স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হাতে গড়া দল বিএনপি। স্বাধীনতা মুক্তিযুদ্ধ সবসময়ই আমাদের প্রেরণার উৎস। এটা অনন্তকাল ধরে চলবে। স্বাধীনতার প্রশ্নে গোটাদেশের মানুষ আজও ঐক্যবদ্ধ। বাঙালি জাতির সবচেয়ে বড় অর্জন এই মুক্তিযুদ্ধ। এটা উপেক্ষা করলে নিজের দেশের সঙ্গে বেঈমানি করা হয় বলছেন এই বিশিষ্টজনরা।
বিএনপি বলছে, মুক্তিযুদ্ধই রাষ্ট্রের ভিত্তি, একাত্তর অস্বীকার করলে দেশ থাকবে না। ১৯৭১ না হলে বাংলাদেশ হতো না। একাত্তর আমাদের সম্মানের ও গৌরবের। ২০২৪ হলো সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য তরুণদের জীবনের একটি প্রতিচ্ছবি। একাত্তরে আমরা প্রিয় মাতৃভূমি পেয়েছি। আর চব্বিশে পেয়েছি মতপ্রকাশের মুক্ত স্বাধীনতা ও ফ্যাসিবাদমুক্ত দেশ। এজন্য জুলাইও অস্বীকার করার কোন ধরনের সুযোগ নেই। কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছে ছাত্র-জনতা। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপিসহ ছোট-বড় সব দল মিলে আমরা চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানকে সফল করেছি।
সম্প্রতি কয়েকটি জনসভায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধই বাংলাদেশের ভিত্তি। ‘৭১’কে বাদ দিলে দেশের অস্তিত্ব থাকবে না। তিনি বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপিকে জয়ী করতে সবাই ‘একাত্তরের মতো ঐক্যবদ্ধ’ থাকুন।
তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালে যুদ্ধ হয়েছিল। তরুণ-যুবক যারা, তারা আপনারা বইয়ের পাতায় পড়েছেন, মুরুব্বি যারা আছেন, আমাদের বয়সী যারা আছেন, তারা দেখেছেন, জানেন; সেই যুদ্ধে দেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল, সেই যুদ্ধে বহু মানুষ শহীদ হয়েছিল। পরবর্তীতে ২৪ সালের ৫ আগস্ট সেই স্বাধীনতাকে রক্ষা করেছে এই দেশের ছাত্র-জনতাসহ সকল শ্রেণিপেশার মানুষ।
বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, সেই একাত্তর সালের যুদ্ধই হোক, ২৪-এর আন্দোলনই হোক, কে পাহাড়ি মানুষ, কে সমতলের মানুষ, কে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মানুষ, এটি কিন্তু কেউ দেখেনি। রাজপথে সবাই পাশাপাশি আন্দোলন করেছে, একাত্তর সালে যুদ্ধে সবাই একসাথে যুদ্ধ করেছে। কে মুসলিম, কে খ্রিষ্টান, কে অন্য ধর্মের মানুষ, কেউ দেখেনি। এবারও ১২ তারিখে নির্বাচনে আমাদের সকলকে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষ একসাথে থাকতে হবে।
তিনি বলেন, একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি যেন বাংলাদেশে রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতায় আসতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
এ প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, মুক্তিযুদ্ধ না মানলে ‘বাংলাদেশকে অস্বীকার করা হবে। তিনি বলেন, সবাই যেমন ‘বাংলাদেশকে মেনে নিয়ে’ রাজনীতি করছে, জামায়াতও তাই।
জামায়াতের এই নেতা বলেন, আমরা বাংলাদেশের আইনি প্রক্রিয়া ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া মেনেই রাজনীতি করে আসছি। দেশটা বাহাত্তরের সংবিধান অনুযায়ী চলেছে, নানা সময়ে সংশোধন হয়েছে। এখন প্রেক্ষাপট যেটা তৈরি হয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ আমাদের একটি অর্জন, এটা বারবার বলেছি। বাংলাদেশকে মেনে নিয়েই কিন্তু সবাই রাজনীতি করছে। আমরাও তাই। সুতরাং এখানে পেছনের কথা টানার কোনো সুযোগ নাই। মুক্তিযুদ্ধ না মানলে বাংলাদেশকে তো অস্বীকার করা হয়ে যাবে। সুতরাং নির্বাচনের প্রশ্ন আসবে কীভাবে। জুলাইটা হুবহু না হলেও জনআকাক্সক্ষার জায়গা থেকে এমন জায়গায় পৌঁছে গেছে, যেটা ধারণ না করে ভবিষ্যতে রাজনীতি করা কঠিন। সেই জায়গা থেকে আমরা বলেছি, যে জুলাই স্পিরিটকে আমরা ধারণ করি।
এ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, একাত্তরই ভোটের ফ্যাক্টর। তবে ভোটের মাঠে ৭১ নিয়ে আমি কোন বিতর্ক দেখছি না। ভোটে তেমন একটা প্রভাব পড়বে না বলে মনে করেন তিনি।
তিনি বলেন, একাত্তের প্রশ্নে এখনো যারা জামাতকে অন্যভাবে দেখছেন, তারা কি বিএনপির দিকে ঝুকবে কিনা-তা এখনই বলা যাবে না। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, বিতর্ক না থাকলে ভোটের প্রভাবে আসবে বলেই তো আমার মনে হয় না। ৭১’ নিয়ে কোন দল কোন বিতর্ক করে নাই সুতরাং এটা নিয়ে ভোটের মাঠে কোনরকম প্রভাব পড়বে না।
ভোটের মাঠে ৭১ প্রসঙ্গে কোন প্রভাব পড়বে কিনা-জানতে চাইলে এ প্রসঙ্গে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইসচ্যান্সেলর আবদুল লতিফ মাসুম বলেন, ভোটের মাঠে তেমন বেশি একটা প্রভাব পড়বে না। এখন আর অতীত মনে রাখে না। সামনে যেটা আসে সেটাই মনে রাখে। জামায়াতকে বিভিন্ন সময়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে কোনঠাসা করে রাখা হয়েছে। এখন আর সে হিসেব নেই।
তিনি বলেন, তরুণ সমাজ মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি। তারা দেখেছে স্বৈরাচারী শাসনকাল। ২৪ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের নির্যাতন-নিপীড়ন ও হতাহতের দৃশ্য তাদের চোখে এখনও জাগ্রত। তবে তরুণদের নয়, মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে প্রবীণদের ভোটের অনুপাতে অন্যান্য দলের চেয়ে বিএনপি কিছু বেশি পেতে পারে।
ভোরের আকাশ/এসএইচ