গণসংযোগে ব্যস্ত প্রার্থীরা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তফসিল ঘোষণার পরপরই রাজনৈতিক দলগুলো পুরোপুরি নির্বাচনমুখী। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে নতুন উদ্যমে গণসংযোগে নেমে পড়েছেন দলের নেতারা। নিজ নিজ দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে ভোটারদের ঘরে ঘরে ছুটছেন প্রার্থীরা। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে নেমে এসেছে দারুণ প্রাণচাঞ্চল্য। দীর্ঘ দেড় দশক পর ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন দেশের সর্বস্তরের জনগণ। কাজেই কাঙ্খিত স্বপ্ন পূরণ হতে চলছে দেশের আপমর জনগণের- এমনটাই ভাবছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপিসহ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন, এনসিপি, গণঅধিকারসহ সব রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরাও ব্যস্ত গণসংযোগে।
এবারের জাতীয় নির্বাচনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ফ্যাসিবাদী দল আওয়ামী লীগ অংশ নিচ্ছে না। ফলে দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের বদলে এ মুহূর্তে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপিকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে এক সময়ের জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামীকে। এ দুই রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা নির্বাচনী মাঠে এখন পরস্পরের মুখোমুখি। সারাদেশে শুরু হয়েছে নির্বাচনী জোয়ার। রাজনৈতিক দলগুলোর ভোটযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় প্রার্থীরা ব্যাপক গণসংযোগ শুরু করেছেন। ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা করছেন তারা- মনে করছেন এই রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সারাদেশে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। বিএনপি-জামায়াতসহ প্রায় সব রাজনৈতিক দলের প্রার্থী জোরেশোরে গণসংযোগ শুরু করেছেন। ঢাকায় যেসব প্রার্থী অবস্থান করছিলেন, তারাও এখন নিজ নিজ এলাকায়। দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে নেমে পড়েছেন ভোটের মাঠে। যাচ্ছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে, দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। নির্বাচন কমিশনের আহ্বান অনুযায়ী নিজ নিজ এলাকায় প্ল্যাকার্ড-ফেস্টুন সরিয়ে ফেলার কাজও করছেন দলগুলোর প্রার্থীরা।
দলীয় নেতা-কর্মী ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরা গণসংযোগ, মতবিনিময় সভা আর ভোটারদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করে চলেছেন। বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা আত্মগোপনে থাকলেও তাদের ভোটারদের কাছে টানতে চেষ্টা করছে বড় দুটি দলই। অন্য দলগুলোর মধ্যে জাতীয় পার্টি এখনো নিষ্ক্রিয়। বামপন্থি দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিকে (সিপিবি) মাঝেমধ্যে কিছু কর্মসূচি করতে দেখা যায়। জয় পেতে ভোটের মাঠে রাজনৈতিক দলগুলো নিজ নিজ কৌশলে এগিয়ে যাচ্ছে। নানা সমীকরণে ভোটের পাল্লা ভারি করতে সমমনা দলগুলোকেও কাছে টানছে বড় দলগুলো।
দলগুলোর বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সবার আগে এবার জামায়াতে ইসলামী ২৯৮ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে। বিএনপি ইতোমধ্যেই ২৭২ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। বাকি ২৮ আসনের মধ্যে কিছু সমমনা দলগুলোকে ছাড়বে। আর অন্য আসনগুলো দলীয় প্রার্থীদের দেবে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ১২৫ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বেশ ক’টি দল প্রার্থী ঘোষণা করেছে। বাকি দলগুলোও শিগগিরই প্রার্থী ঘোষণা করছে বলে জানা যায়।
আগে থেকেই এবার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মনোনীত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ভোটের মাঠে সক্রিয়। তবে তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সারাদেশে নির্বাচনী এলাকার পাড়া-মহলা ও হাটবাজারগুলোতে ভোটের প্রচার আরও জোরদার হচ্ছে। বিভিন্ন শহর-বন্দরে বসবাসকারী স্বজনরাও নিজ নিজ সংসদীয় এলাকায় গিয়ে স্বজন অথবা দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করছেন। সেই সঙ্গে সাধারণ ভোটাররাও পছন্দের প্রার্থী খুঁজতে বিভিন্নভাবে তৎপর হয়েছেন। আচরণবিধি পালনে প্রার্থীদের চাপে রাখতে নির্বাচন কমিশনও অধিকতর সক্রিয় হয়েছে।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অনুকূল পরিবেশ পেয়ে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও নতুন দল এনসিপিসহ অর্ধ শতাধিক রাজনৈতিক দল এবার জোরেশোরে নির্বাচনী মাঠে সক্রিয়। জনগণের ভোটে ক্ষমতায় যেতে নানামুখী কৌশলে তারা এখন তৎপর। বিএনপির প্রচার প্রকাশ্যে বেশি দেখা গেলেও অন্যান্য ক’টি দলের প্রচার চলছে ভেতরে ভেতরে। তাই দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে শেষ পর্যন্ত ভোটের হিসাব-নিকাষ কোন দিকে যায় তা দেখার বিষয়।
অভিজ্ঞ মহলের মতে, বাহ্যিক দৃষ্টিতে বিএনপির অবস্থান শক্ত মনে হলেও জামায়াতসহ আরও ক’টি দল অনেক দিন ধরেই জনগণের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আবার এনসিপি মনে করছে ৫ আগস্ট আন্দোলন সফল করতে তারা জীবন বাজি রেখে মাঠে সক্রিয় ছিল। তাই তাদের দেশের মানুষ মূল্যায়ন করবে। তবে শেষ পর্যন্ত ভোটের সমীকরণ কোন দিকে যায় তা আগামী এক মাসের মধ্যেই ফুটে উঠবে।
এবারই প্রথমবারের মতো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ভোটার হিসেবে অংশ নিতে প্রবাসী, কারাবন্দি ও নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি এবং নিজ ভোটার এলাকার বাইরে অবস্থানরত সরকারি চাকরিজীবীরা নির্বাচন তফসিল ঘোষণার দিন থেকে ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধন করতে পারবেন। নিবন্ধন করা ভোটারদের কাছে নির্দিষ্ট সময়ে ব্যালট পেপার চলে যাবে তাদের ঠিকানায়। ভোটদানের পর আবার নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যেই তাদের ব্যালট পেপার রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পাঠাতে হবে।
দেশের ইতিহাসে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনে এবারই প্রথম হতে যাচ্ছে গণভোট। আর এ কারণেই এবারের নির্বাচন নির্বাচন কমিশনের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জের কথা মাথায় রেখেই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে ইসি। নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতিও সেভাবেই নেওয়া হয়েছে। এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যালট সাদা-কালো এবং গণভোটের ব্যালট হবে গোলাপি রঙের ।
এ প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, তফসিল ঘোষণা নির্বাচনের প্রাথমিক ধাপ। সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনা করার জন্য নির্বাচন কমিশনকে সাহসিকতার সঙ্গে আইনকানুন অনুযায়ী কাজ করতে হবে। তবে রাজনৈতিক নেতাদের সদিচ্ছা ছাড়া সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে না।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, নির্বাচনে দলের বিজয় নিশ্চিত করতে সারাদেশের সর্বস্তরের নেতাকর্মী সক্রিয় রয়েছেন। তফসিল ঘোষণার আগে থেকেই আমরা নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছি। এখন সেই প্রচার আরও জোরদার করা হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে যা যা করণীয় সবই করছে নির্বাচন কমিশন। একটি ভালো নির্বাচন উপহার দিতে ইসির সবাই দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। তবে একটি ভালো নির্বাচন উপহার দিতে রাজনৈতিক দলসহ দেশের সর্বস্তরের মানুষকে সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসতে হবে।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও জাতীয় সংসদের সাবেক বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক বলেন, তফসিলের পর সাধারণ মানুষ খুব আনন্দিত। মানুষের মনে যে সন্দেহ ও শঙ্কা ছিল, তা দূর হয়েছে। মানুষের মধ্যে আগের চেয়ে স্বতঃস্ফূর্ততা ফিরে এসেছে। তবে ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপটা কী হতে যাচ্ছে, সেটাও দেখার ব্যাপার।
তিনি বলেন, প্রার্থিতা ঘোষণার পর থেকেই দলের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছি। তফসিলের পর গণসংযোগ আরও চাঙা হয়েছে। এই আসনে ধানের শীষের জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। তফসিল ঘোষণার পরই শরীয়তপুর-২ আসনে গণসংযোগ ও প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন জামায়াতে ইসলামী মনোনীত সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হোসাইন বকাউল। ভোট প্রার্থনায় নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন স্থান মুখরিত হয়ে উঠেছে। গণসংযোগ ও প্রচারণায় সর্বত্র উৎসবের আবহ বিরাজ করছে। প্রার্থীর সঙ্গে তার সমর্থকেরাও গণসংযোগ এবং প্রচারণার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর বলেন, আমরা অনেক আগে থেকে নির্বাচনি প্রচারণার মধ্যে আছি। দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এ মুহূর্তে সবার নজর জাতীয় নির্বাচন।
তিনি বলেন, তফসিল ঘোষণার পরই প্রচার-প্রচারণা আরো জোড়দার হচ্ছে। জয়ের প্রত্যাশায় ভোটারদের কাছে টানতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে প্রার্থীরা।
ভোরের আকাশ/এসএইচ