ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন
ফ্যাক্টর নতুন ভোটার

আর মাত্র ২১ দিন পরই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয়ের টার্গেটে ভোটের মাঠে রয়েছে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ ৫১টি রাজনৈতিক দলের প্রার্থী। উৎসবমুখর প্রচার-প্রচারণার পাশাপাশি জয়ের টার্গেট নিয়ে প্রার্থীরা বিভিন্ন কৌশলে কাছে টানছেন নতুন ভোটার। এমনকি তাদের চোখ থাকছে আওয়ামী সমর্থিত ভোটোরের দিকেও-এমনই চিত্র ফুঠে উঠেছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দৃষ্ঠিতে।
তাদের মতে, নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ভোট নিয়ে চলছে নানা সমীকরণ। এবার জয়-পরাজয়ে নিয়ামক বা ফ্যাক্টর হবেন নতুন ভোটাররা। এ অবস্থায় নতুন অথাৎ তরুণ ভোটার আকর্ষণে কৌশলী সব দলের প্রার্থীরা। তাদের মন জয়ে দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। এ বিষয়টি মাথায় রেখে তারুণ্যবান্ধব নানা পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে রয়েছেন প্রার্থীরা-এটাই বলছেন দেশের এই বিশিষ্টজনরা।
রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিপুল এই গোষ্ঠীর মন জয় করতে নির্বাচনি ইশতেহারে কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো। তরুণদের আকাক্সক্ষা ও প্রত্যাশাই হয়ে উঠছে নির্বাচনি প্রতিযোগিতার মূল কেন্দ্রবিন্দু। আর তাই তরুণদের মন জয় করতে কর্মসংস্থান, বেকার ভাতাসহ নানা আকর্ষণীয় প্রতিশ্রুতি নিয়ে ভোটের মাঠে রয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিগত সাড়ে ১৫ বছর ধরে নতুন অথাৎ তরুণরা নানাভাবে অবহেলিত। ভোটার হওয়া সত্ত্বেও তারা ভোট দিতে পারেননি। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর তাদের প্রত্যাশা ছিল অচিরেই দেশে আবার গণতন্ত্র ফিরে আসবে, অর্থনীতির চাকা সচল হবে, সর্বক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা আসবে। কাজেই যাকে বা যে দলকে ভোট দিলে দেশের ও দেশের জনগনের কল্যাণ হবে, তাদেরকেই ভোট দিবে-নতুন ভোটাররা-এমনই ভাবছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সী ভোটারের সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার কোটি। এই বিশাল জনগোষ্ঠী শুধু সংখ্যায় নন, রাজনৈতিক সচেতনতা ও ডিজিটাল সক্ষমতার দিক থেকেও আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি শক্তিশালী।
নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা অনুযায়ী, দেশে ১৮-২১ বছর বয়সী ভোটার রয়েছেন ৮৫ লাখ ৩১ হাজার ৫৩৮ জন। ২২-২৫ বছর বয়সী ভোটার ১ কোটি ১৯ লাখ ৬২ হাজার ১০৬ জন এবং ২৬-২৯ বছর বয়সী ভোটার ১ কোটি ২১ লাখ ৬৬ হাজার ১৬২ জন। ৩০-৩৩ বছর বয়সী ভোটার রয়েছেন ১ কোটি ৬ লাখ ৮৬ হাজার ৬১৫ জন। এই চার বয়স শ্রেণি মিলিয়ে তরুণ ভোটারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে চার কোটিতে। কাজেই সংখ্যাগত ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবের দিক থেকে নতুন মানে তরুণ ভোটারদের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি বলছেন দেশের বিশিষ্টজনরা।
বিএনপির সূত্রে জানা যায়, তরুণ প্রজন্মের আকাক্সক্ষা প্রাধান্য দিয়ে নির্বাচনি ইশতেহার প্রস্তুত করেছে বিএনপি। যেখানে রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতে দলের ঘোষিত ৩১ দফা, জনকল্যাণমুখী কর্মসূচি থাকবে। জানা গেছে, যুক্তরাজ্যের আদলে বাংলাদেশে ক্রিয়েটিভ ইকোনমি গড়ে তোলার পরিকল্পনা এবং ক্ষমতায় গেলে প্রথম ১৮ মাসে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির অঙ্গীকারও ইশতেহারে স্থান পাচ্ছে। এছাড়া শিক্ষাখাতে বাজেট বাড়ানো, স্কুল পর্যায় থেকেই ব্যবহারিক ও কারিগরি শিক্ষা চালুর পরিকল্পনা করছে বিএনপি। তথ্যপ্রযুক্তি, খেলাধুলা, শিল্প-সংস্কৃতি, ডেন্টাল হাইজিন, মেডিকেল টেকনিশিয়ানসহ বিভিন্ন কারিগরি শিক্ষা চালুর কথা ইশতেহারে বলা হবে। প্রাথমিক স্তর থেকে ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা এবং মাধ্যমিক স্তর থেকে আরও একটি ভাষা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। আরবি, জার্মান, ফরাসি, জাপানি ও চীনা ভাষা শেখার সুযোগ পাবে শিক্ষার্থীরা, যাতে তারা আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারেন। ‘আলিবাবা’ ও ‘অ্যামাজনে’র মতো বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানি, ১০ লাখের বেশি ফ্রিল্যান্সারের নিরাপদ লেনদেন নিশ্চিত করতে পেপাল ও ওয়াইজ চালু, ১৮ মাসে এক কোটি কর্মসংস্থান, প্রতিটি জেলায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প স্থাপন, ৫০ লাখ ফ্যামিলি কার্ড, পাঁচ বছরে পাঁচ কোটি গাছ লাগানো এবং চা শিল্পে চাঁদাবাজি বন্ধ ও দুর্নীতি দমনের পরিকল্পনাও থাকছে দলটির ইশতেহারে।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ক্ষমতায় গেলে প্রথম দিন থেকে আমাদের কাজ করতে হবে। এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান; এটা আমরা হোমওয়ার্ক করেই বলেছি। তারেক রহমানের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে এবং তা বাস্তবায়ন করতে হবে।
জামায়াতের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জামায়াতে ইসলামী তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে তরুণদের জন্য নৈতিক শিক্ষা, কর্মসংস্থানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা ও উদ্যোক্তা উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়েছে। দলটির মতে, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা তরুণদের চাকরির উপযোগী করে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়েও তরুণরা চাকরি পাচ্ছেন না। এই সংকট উত্তরণে ইশতেহারে তারা কর্মমুখী শিক্ষা চালুর অঙ্গীকার করেছে। এছাড়া শিশু বয়স থেকেই নৈতিকতা, সততা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করার শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলেছে জামায়াত, যা ভবিষ্যৎ তরুণ সমাজকে দুর্নীতিমুক্ত নেতৃত্বে রূপান্তরের ভিত্তি হিসেবে দেখছে দলটি। একই সঙ্গে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ বাড়ানো এবং শিক্ষা ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি দলটির।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নয়, উদ্যোক্তা হিসেবেও গড়ে তোলার পরিকল্পনা দলটির। দেশীয় শিল্প বিকাশ, আমদানি-রপ্তানিতে স্বচ্ছতা, কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণের মাধ্যমে তরুণদের জন্য নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরির কথা বলেছে দলটি। আর বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সরকারি প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ, ব্যয় কমানো ও সিন্ডিকেট ভাঙার ঘোষণা দেওয়া হবে তাদের ইশতেহারে।
এ প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জোবায়ের বলেন, ভোটারদের এক তৃতীয়াংশ তরুণ। তাদের জন্য আমাদের আগ্রহ অনেক বেশি। আমরা বলে আসছি, বেকার ভাতা নয়, কর্মসংস্থানে অগ্রাধিকার দেব। বেকারত্ব নির্মূলে আমরা কাজ করবো।
এনসিপির সূত্রে জানা যায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের হাত ধরে গড়ে ওঠা দল এনসিপি তাদের ইশতেহারে তরুণদের রেখেছে রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দুতে। দলটির ২৪ দফা ঘোষণার বড় অংশই তরুণদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।
জানা গেছে, এনসিপি তরুণদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছে নতুন সংবিধান ও ‘দ্বিতীয় রিপাবলিক’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। দলটি মনে করে, বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থা তরুণদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা দমিয়ে রেখেছে। তাই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কার, বিচারব্যবস্থা ঢেলে সাজানো ও প্রশাসনকে সেবামুখী করার মাধ্যমে তরুণদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে চায় দলটি। এনসিপির ইশতেহারে তারুণ্য ও কর্মসংস্থানকে আলাদা দফা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি, গবেষণা, উদ্ভাবন ও ডিজিটাল বিপ্লবকে তরুণদের কর্মসংস্থানের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে দেখছে এনসিপি। ছাত্রসমাজকে অগ্রাধিকার দিয়ে শিক্ষা সংস্কার, গবেষণায় বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা উন্নয়নের কথা বলা হবে ইশতেহারে। নারীদের জন্য নিরাপত্তা, অধিকার ও ক্ষমতায়ন, ধর্ম-বর্ণ-জাতিসত্তাভেদে সমতা এবং জুলাই অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া তরুণীদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, এসব বিষয় এনসিপির ইশতেহারে থাকবে।
এ প্রসঙ্গে দলটির একাধীক নেতা বলেন, আমরা দল থেকে একটি ইশতেহার দিবো। আসন সমঝোতা হয়েছে যেসব দলের সঙ্গে, সবাই মিলে একটা আলাদা ইশতেহার দেবো। ইশতেহারে কোন কোন বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে সেগুলো নিয়ে কাজ চলছে। তরুণ প্রজন্মের চাহিদাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ইশতেহারের প্রণয়নের কাজ চলছে।
ইসলামী আন্দোলনের বিশ্বস্থ সূত্রে জানা গেছে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ক্ষমতায় এলে তারা তরুণ জনগোষ্ঠীর দক্ষতা বৃদ্ধি ও বিদেশে যাওয়া শ্রমিকের মানোন্নয়ন করতে চায়। সব ধরনের শিক্ষায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও শিল্পায়ন, বৈদেশিক কর্মসংস্থান, বাণিজ্যের সঙ্গে শিক্ষাকে সমন্বয় করার ইশতেহার আনছে দলটি।
এ প্রসঙ্গে ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় প্রচার ও দাওয়াহ সম্পাদক শেখ ফজলুল করীম মারুফ বলেন, আমরা কোনো মুখরোচক গাল-গল্প ইশতেহারে দিচ্ছি না। এতদিনের মধ্যে কোটি কোটি কর্মসংস্থান.. অনেকে বলছেন। যেটা বাংলাদেশের বাস্তবতায় সম্ভব নয়। আদর্শমুখী শিক্ষাব্যবস্থা থেকে কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থায় আমাদের যেতে হবে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স, বিভিন্ন কম্পিউটার ল্যাংগোয়েজ শেখানোর পাশাপাশি কর্মমুখী শিক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হবে। শিল্পায়ন, বৈদেশিক কর্মসংস্থান, বাণিজ্যের সঙ্গে শিক্ষাকে সমন্বয় করা হবে।
তিনি আরও বলেন, বৈদেশিক কর্মসংস্থানে আমরা পিছিয়ে আছি। আমাদের শ্রমিকরা স্বল্প বেতনে কাজ করছেন। বিদেশে দক্ষ লোক পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে। মোটকথা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডকে কাজে লাগানো হবে।
এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে মেধাভিত্তিক সমাজ গঠনের অঙ্গীকার প্রয়োজন। আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আমরা কতটুকু অগ্রসর হতে পেরেছি তার ওপর। আমাদের তরুণদের মেধার সর্বোচ্চ বিকাশ এবং মেধার সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে।
তিনি বলেন, তরুণদের জন্য যদি মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে পারি, তাদের জন্য যদি সুযোগ সৃষ্টি করতে পারি তবে ডেমোক্রেটিক ডিভিডেন্ড বাস্তবে প্রতিফলিত হবে।
ভোরের আকাশ/এসএইচ