হাবিপ্রবির সেমিনারে ইউজিসি সদস্য প্রফেসর ড. মামুন
চাকুরীর সুযোগ সৃষ্টি করতে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য চালু হচ্ছে তিনটি বিশেষ কোর্স

হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (হাবিপ্রবি) ‘The Role of Academia-Industry Collaboration: Research, Excellence, Innovation and Industrialization’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকাল ১০.৩০ ঘটিকায় অডিটোরিয়াম-১ এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মো. এনামউল্যা’র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে প্রধান অতিথি এবং মূখ্য আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সদস্য প্রফেসর ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মো. নওশের ওয়ান এবং যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ফারুক হাসান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চাকুরীর বাজারের জন্য আরও দক্ষ করে গড়ে তুলতে আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিষয়ভিত্তিক কোর্সের পাশাপাশি তিনটি বিশেষ দক্ষতা উন্নয়নমূলক কোর্স চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সেমিনারের প্রধান অতিথি ও মূখ্য আলোচক বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন।
তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে শুধু বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান অর্জন করলেই একজন শিক্ষার্থীর চাকরির বাজারে সফল হওয়া নিশ্চিত নয়। একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি, চাকরির প্রস্তুতি, যোগাযোগ দক্ষতা, পেশাগত আচরণ ও নৈতিকতার মতো বিষয়েও শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে তুলতে হবে। এ লক্ষ্যেই আগামী জানুয়ারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের জন্য ICT (Information and Communication Technology) & AI (Artificial intelligence), Employability Skill এবং Ethics and Professionalism—এই তিনটি বিশেষ কোর্স চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব কোর্স শিক্ষার্থীদের একাডেমিক জ্ঞানের পাশাপাশি আধুনিক কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করবে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের Higher Education Acceleration & Transformation (HEAT) প্রজেক্টের অধীনে কোর্সগুলো চালু করা হবে। ড. মামুন বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষা খাতের আধুনিকায়নের পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, Industry-Academia Collaboration এবং Internationalization of Education-এর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে তৃতীয় ভাষা শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে আরও বেশি সুযোগ তৈরি করার লক্ষ্য রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ তৈরি করা হলে তারা দেশীয় চাকরির বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারেও নিজেদের দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে পারবে। তৃতীয় ভাষায় দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে বিদেশি প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হবে, আন্তর্জাতিক শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারিত হবে এবং বৈশ্বিক কর্মবাজারে বাংলাদেশের তরুণদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। দেশ-বিদেশে দ্রুত ককর্মসংস্থান এর সুযোগ সৃষ্টি হবে। তরুনদের জন্য সরকারের নানা ধরনের কর্মমুখী উদ্দ্যোগ এর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তরুণদের কর্মসংস্থান ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে বর্তমান সরকার বিভিন্ন কর্মমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সঙ্গে কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং শিল্পখাতের চাহিদার সমন্বয় ঘটানোই এসব উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। সরকারের ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটেও তরুণদের দক্ষতা ও কর্মসংস্থানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তি খাতে প্রতি বছর ২ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি স্টার্টআপ ও তরুণ উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে ৫০০ কোটি টাকার Startup Fund প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ। আগামী পাঁচ বছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ধীরে ধীরে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে তৈরি না করে চাকরি সৃষ্টিকারী হিসেবেও গড়ে তুলতে হবে। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে Innovation Hub, Incubation Centre, Startup Ecosystem এবং শিল্পখাতের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকও গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ‘UDYOG—Upazila-Driven Youth Opportunity for Growth’ কর্মসূচি চালু করেছে। এর মাধ্যমে উপজেলা পর্যায় থেকে সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তাদের খুঁজে বের করে অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও বাজারসংযোগের সুযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এই কর্মসূচির আওতায় নির্বাচিত তরুণ উদ্যোক্তারা তাদের প্রকৃত ব্যবসায়িক প্রয়োজন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন পেতে পারেন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ব্যাংক ঋণ এবং সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অনুদান হিসেবে দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। কোনো জামানত ছাড়াই এ অর্থায়নের সুযোগ রাখা হয়েছে এবং উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও বাজার সংযোগেও সহায়তা দেওয়া হবে। তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ শুধু চাকরির জন্য প্রস্তুত করা নয়; তাদের এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন দক্ষতা অর্জন করতে পারে, নিজের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে এবং অন্যদের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।’
সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মো. এনামউল্যা প্রধান অতিথি, উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী এবং শিল্প মালিকসহ সকলকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আন্তরিক অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, আজকের প্রতিপাদ্য বিষয়টি বর্তমান সরকারের একটি নির্বাচনী ইশতেহারের অংশ। বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু গ্র্যাজুয়েট তৈরি করলে হবেনা, তাদেরকে কর্মমুখী গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। যাতে গ্র্যাজুয়েশন করার পর কর্মসংস্থান হয়।
তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসা ও শিল্পায়নের উন্নয়নে প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষ সিলেবাস প্রনয়ণ করা হবে। বিশেষকরে একাডেমিয়া-ইন্ডাস্ট্রি কলাবোরেশন বাস্তবায়নের জন্য আমরা আগামী শিক্ষাবর্ষ হতে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ প্রদান করব। এজন্য ভিসি মহোদয় প্রধান অতিথির সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রজন্মকে কর্মমুখী ও বাস্তবমুখী শিক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে একাডেমিয়া-ইন্ডাস্ট্রি কলাবোরেশনের কোনো বিকল্প নেই। তাই, শিক্ষার্থীদের অর্জিত তাত্ত্বিক জ্ঞানকে বাস্তব কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হলে উদ্যোক্তা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
সেমিনারে কীভাবে শিল্পখাত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও গবেষণাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারে, শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে বিশ্ববিদ্যালয় কী ভূমিকা রাখতে পারে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টার্নশিপ ও বাস্তব প্রশিক্ষণের সুযোগ কীভাবে বৃদ্ধি করা যায় একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচালিত গবেষণার ফলাফল ও উদ্ভাবনগুলো শিল্পক্ষেত্রে প্রয়োগ এবং বাণিজ্যিকীকরণের সম্ভাবনার উপর বিশেষভাবে আলোকপাত করা হয়।
আরো উপস্থিত ছিলেন দিনাজপুর চেম্বার অব কমার্স ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক আখতারুজ্জামান জুয়েল, মনজুর মূর্শেদ সুমন, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মোহন পাটোয়ারী, প্রফেসর ড. মো. মহিদুল হাসান এবং সহকারী অধ্যাপক সুস্মিতা শারমিন এর সঞ্চালনায় উক্ত সেমিনারে হাবিপ্রবির রেজিস্ট্রার প্রফেসর ড. মো. আবু হাসান এবং পরামর্শ ও নির্দেশনা বিভাগের পরিচালক প্রফেসর ড. এস এম এমদাদুল হাসানসহ দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও নীলফামারীসহ উত্তরাঞ্চলের ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এবং সংশ্লিষ্ট প্রায় ৫০ জন প্রতিনিধিসহ শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন।
ভোরের আকাশ/আ.র