৫০ বছর ধরে মাত্র ১ টাকায় শিক্ষকতা করছেন লুৎফর রহমান

ভোরের আলো ফুটতেই, নিস্তব্ধ গ্রাম জেগে ওঠার আগেই, শিক্ষার আলো ছড়াতে বেরিয়ে পড়েন ৭৮ বছর বয়সী প্রবীণ শিক্ষক লুৎফর রহমান।
গাইবান্ধা সদর উপজেলার বাগুড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা এই শিক্ষক কখনো পায়ে হেঁটে, আবার কখনো জরাজীর্ণ পুরোনো বাইসাইকেল চালিয়ে, টানা ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি ছুটে চলেছেন সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র শিশুদের দ্বারে দ্বারে।
পারিশ্রমিক মাত্র ১ টাকা। হ্যাঁ, প্রতিদিন ১ টাকা নিয়েই গড়ে তুলেছেন হাজারো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ। এলাকার গন্ডি পেরিয়ে তাই তো তিনি পরিচিত পেয়েছেন ১ টাকার মাস্টার নামে।
১৯৭২ সাল থেকে শুরু নিজ উদ্যোগে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি। নতুন প্রজন্মকে আলোকিত করলেও, তার নিজের জীবনের গল্পটা যেন কষ্টে মোড়ানো এক সংগ্রামের ইতিহাস।
দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করেও সমাজের জন্য কাজ করে যাওয়া এই মানুষটির জন্যই বদলে যাচ্ছে বাগুড়িয়া, মদনেরপাড়া, তালতলা, ঘাগোয়া, গিদারী, খোলাহাটি, কঞ্চিপাড়া, সৈয়দপুর, একাডেমিসহ আশপাশের এলাকার শিক্ষার চিত্র। নিজের জীবনে আক্ষেপ থাকলেও, শিক্ষার্থীদের সাফল্যই তার সবচেয়ে বড় আনন্দ।
বর্তমানে তিনি স্ত্রী লতিফুন বেগম, দুই ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে সেখানেই বসবাস করছেন। বড় ছেলে লাভলু মিয়া অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালান, ছোট ছেলে মশিউর রহমান দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স সমমান) সম্পন্ন করেছেন।
তার জীবনের পথটা কখনো সহজ ছিল না। এক সময় সচ্ছল পরিবার থাকলেও, ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ বন্যা আর নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে ওয়াপদা বাঁধের পাশে ছোট্ট টিনের ঘরে আশ্রয় নিতে হয় তাকে। সেখান থেকেই শুরু তার দীর্ঘ সংগ্রামের পথচলা।
জানা যায়, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই, ১৯৭২ সালে গুণভরি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন তিনি। কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে আর কলেজে ভর্তি হওয়া হয়নি। তবুও শিক্ষা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেননি তিনি। নিজে না পাওয়ার কষ্টকে শক্তিতে রূপ দিয়ে, শিশুদের ঝরে পড়া ঠেকাতে শুরু করেন বাড়ি বাড়ি গিয়ে পড়ানো। শুরুতে বিনা পারিশ্রমিকে, পরে প্রতিদিন মাত্র ১ টাকা করে নেওয়া শুরু করেন।
কথা হয় শিক্ষকের বড় ছেলে লাভলু মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, 'আব্বা আমাদের অভাবের কারনে পড়াশোনা করাতে পারে নি। অথচ তিনি গ্রামে গ্রামে শিক্ষা দিয়ে বেড়ান ১টাকার বিনিময়ে। তিনি ছোটদের ভালোবাসেন সেই আদর ভালোবাসা থেকে পড়াশোনা করান। বর্তমানে আব্বার শারীরিক অবস্থা আগের মতো নাই। বয়স হয়ে যাচ্ছি। তার পরেও তিনি ঘরে বসে না থেকে বাচ্চাদের পড়াতে বেড়িয়ে পড়েন।'
শিক্ষক লুৎফর রহমান বলেন, 'মাস্টারির প্রথমের দিকে
বিনা পয়সায় পড়াতাম, পরে নামমাত্র এক টাকা নিতে শুরু করি। কেউ না দিলেও কিছু বলি না। আমার অনেক ছাত্র এখন পুলিশ অফিসার, ডাক্তার, প্রভাষক, অধ্যক্ষ। ওদের সাফল্যই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া।'
তিনি আরও বলেন, 'বর্তমানে খুব কষ্টের মধ্যে আছি। অর্থ অভাবে দিন কাটছে। ঠিকমতো সংসার চালাতে পারছি না , তারপরেও শিশুদের এখনো বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে পড়াচ্ছি। শিশুদের পড়াতে গেলেই অভাবের কথা ভুলে যাই। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বাচ্চাদের সঙ্গে থাকতে চাই।'
চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী ফাতেমা খাতুন বলেন, স্যার খুবই ভালো মানুষ। স্যার খুব আদর করে পড়ান। আমরা না আসলে নিজেই বাড়ি গিয়ে ডেকে ডেকে আনেন। তাই স্যারের কাছে পড়তে ভালো লাগে। ভুল করলেও স্যার বকা তেন না।
আরেক শিক্ষার্থী হানিফ মিয়া বলেন, আমরা প্রতিদিন স্যারকে এক টাকা করে দেই। স্যার আমাদের এত সুন্দরভাবে বুঝিয়ে পড়ান, না বুঝলে বারবার বুঝিয়ে দেন। তার মনে কোনো রাগ নেই। তাই স্যারের কাছে পড়তে খারাপ লাগে না। স্যার ইংরেজি সব চেয়ে বেশি বুঝাতে পারে।
অভিভাবক মালেকা বেগম বলেন, আমার ৪টা বাচ্চা তার কাছে পড়ে বিনিময়ে প্রতিদিন ১টাকা করে দেই। স্যার তাতেই খুব খুশি হন। তার মনে কোনো অহংকার নেই। এত সহজ সরল মানুষ বর্তমানে পাওয়া যাবে না।
আরেক শিক্ষার্থীর বাবা কুদ্দুস মিয়া বলেন, আমি নিজেও স্যারের কাছে পড়েছি এক টাকা দিয়ে। আর আমার ছেলেও এখন তার কাছে পড়ছে ওই এক টাকা দিয়েই। সময়ের সঙ্গে সব কিছুই দাম বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু স্যারের সম্মানি এক টাকাতেই রয়েছে।
অভিভাবক সোহেল মিয়া বলেন, লুৎফর রহমান স্যার এই এলাকার গর্ব। এখন এক শিশুকে প্রাইভেটে পড়াতে হাজার টাকার বেশি খরচ হয়, কিন্তু তিনি নামমাত্র টাকায় বাচ্চাদের শিক্ষা দিচ্ছেন। তার ছাত্ররা এখন অনেকেই বিসিএস কর্মকর্তা ও বিভিন্ন ভালো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছে।
এ বিষয়ে গাইবান্ধা সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. লোকমান হোসেন ভোরের আকাশকে বলেন, 'সমাজের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়া এই শিক্ষকের পাশে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হবে।'
তবে শেষে একটা প্রশ্ন থেকেই যায় এই মানুষগুলোর কারণেই কি এখনও টিকে আছে মানবতা, লুৎফর রহমানদের মতো মানুষরাই হয়তো আমাদের মনে করিয়ে দেন শিক্ষা শুধু পেশা নয়, এটি এক ধরনের সেবা এক ধরনের ভালোবাসা।
ভোরের আকাশ/ র.ই