ফেনী জেলার সমস্যা ও কৃষি-শিল্পের সমন্বয়ে নতুন অর্থনীতির সম্ভাবনা

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা ফেনী। ভৌগোলিক অবস্থান, যোগাযোগব্যবস্থা, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রবাসী আয় ও সীমান্তবর্তী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড—সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতিতে জেলার গুরুত্ব কম নয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও রেলপথের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ফেনীর ওপর দিয়ে গেছে। ফলে রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সঙ্গে সহজ যোগাযোগের পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার সঙ্গেও বাণিজ্যিক সংযোগের সুযোগ রয়েছে।
তবে সম্ভাবনার এই জেলার সামনে রয়েছে বেশ কিছু দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাবদ্ধতা, বন্যা, নদীভাঙন, কৃষিজমি সংকুচিত হওয়া, যানজট, দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা ও শিল্পায়নের ধীরগতি ফেনীর উন্নয়নকে অনেক ক্ষেত্রেই বাধাগ্রস্ত করছে।
বন্যা-জলাবদ্ধতা বড় চ্যালেঞ্জ : ফেনীর সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক সমস্যাগুলোর একটি বন্যা ও জলাবদ্ধতা। মুহুরী, কহুয়া, সিলোনিয়া ও ছোট ফেনীসহ বিভিন্ন নদী-খালের পানি বর্ষা মৌসুমে জনজীবনে দুর্ভোগ সৃষ্টি করে। পাহাড়ি ঢল, অতিবৃষ্টি ও নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় অনেক এলাকায় দ্রুত পানি জমে যায়। কোথাও কোথাও বাঁধ ভেঙে কিংবা উপচে পানি প্রবেশ করে। এতে কৃষিজমি, ঘরবাড়ি, সড়ক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বন্যার ক্ষতি শুধু তাৎক্ষণিক নয়, এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও রয়েছে। ফসল নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি কৃষকের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। অনেক সময় জমিতে বালু ও পলি জমে পরবর্তী মৌসুমে চাষাবাদ কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে কৃষিনির্ভর মানুষের ওপর বাড়ে অর্থনৈতিক চাপ। এ কারণে বন্যাকে শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখলে হবে না। নদী ব্যবস্থাপনা, বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণ, খাল পুনঃখনন ও পানি নিষ্কাশনের সমন্বিত পরিকল্পনার অংশ হিসেবেও বিষয়টিকে দেখতে হবে।
শহরে বাড়ছে জলাবদ্ধতা : ফেনী শহরের আরেকটি বড় সমস্যা জলাবদ্ধতা। সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই শহরের বিভিন্ন সড়ক ও নিচু এলাকায় পানি জমে যাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল ও জলাশয় সংকুচিত হওয়া, ড্রেনেজ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এর অন্যতম কারণ। নগর সম্প্রসারণের সঙ্গে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সমানতালে উন্নত না হলে ভবিষ্যতে এ সমস্যা আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই শহরের উন্নয়ন পরিকল্পনায় খাল, জলাশয় ও প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ সংরক্ষণকে গুরুত্ব দিতে হবে।
যানজটেও নাকাল নগরবাসী : জনসংখ্যা ও যানবাহন বাড়লেও ফেনী শহরের সড়ক ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সেই অনুপাতে আধুনিক হয়নি। অপরিকল্পিত পার্কিং, ফুটপাত দখল, বাজারকেন্দ্রিক যান চলাচল ও রাস্তার ওপর বিভিন্ন ধরনের অবৈধ স্থাপনা যানজটকে আরও তীব্র করছে। একটি আধুনিক শহরের জন্য শুধু সড়ক প্রশস্ত করাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সমন্বিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, নির্দিষ্ট পার্কিং ব্যবস্থা, ফুটপাত দখলমুক্ত করা ও পথচারীবান্ধব নগর পরিকল্পনা।
কর্মসংস্থানের সংকট : ফেনীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা। জেলার বিপুলসংখ্যক তরুণ শিক্ষা শেষ করে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ না পেয়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম কিংবা বিদেশমুখী হন। প্রবাসী আয়ের কারণে অনেক পরিবার অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল হলেও স্থানীয় উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান বাড়ানো না গেলে দীর্ঘমেয়াদে জেলার অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করা কঠিন। তাই তরুণদের জন্য স্থানীয়ভাবে চাকরি ও উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ তৈরি করা জরুরি।
শিল্পায়নে রয়েছে বড় সম্ভাবনা
ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যবর্তী অবস্থান, মহাসড়ক ও রেল যোগাযোগ এবং দেশের প্রধান বন্দরনগরীর কাছাকাছি অবস্থান—সব মিলিয়ে ফেনীতে শিল্প ও লজিস্টিকস খাত বিকাশের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কৃষিভিত্তিক শিল্প, হালকা প্রকৌশল, গার্মেন্টস ও আনুষঙ্গিক শিল্প, গুদামজাতকরণ এবং পরিবহনসেবা এখানে বিকশিত হতে পারে। পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠলে স্থানীয় কর্মসংস্থান বাড়ার পাশাপাশি জেলার অর্থনীতিও আরও গতিশীল হতে পারে।
কৃষি থেকে শিল্পে সংযোগ
কৃষিকে শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে ফেনীর অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। জেলার কৃষকেরা বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদন করেন। কিন্তু উৎপাদনের পর সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় অনেক সময় কৃষকেরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন। আধুনিক হিমাগার, কৃষিপণ্য সংরক্ষণকেন্দ্র, প্যাকেজিং ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে উঠলে কৃষক যেমন লাভবান হবেন, তেমনি নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে।
মৎস্য খাতেও সম্ভাবনা
পুকুর, জলাশয় ও নদীকেন্দ্রিক মাছ উৎপাদনকে আধুনিক প্রযুক্তির আওতায় আনা গেলে ফেনীর মৎস্য উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব। পাশাপাশি মাছ সংরক্ষণ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের অবকাঠামো গড়ে উঠলে স্থানীয় অর্থনীতিতে এ খাতের অবদান আরও বাড়বে।
পর্যটনে নতুন সম্ভাবনা
ফেনীর পর্যটন সম্ভাবনাও অবহেলার নয়। মুহুরী সেচ প্রকল্প, নদী ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, গ্রামীণ পরিবেশ এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থাপনাকে পরিকল্পিতভাবে পর্যটনের আওতায় আনা যেতে পারে। তবে পর্যটন উন্নয়ন মানে শুধু কোনো একটি স্থানের সৌন্দর্যবর্ধন নয়। প্রয়োজন নিরাপদ যাতায়াত, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও খাবারের ব্যবস্থা, পর্যটনবান্ধব তথ্যসেবা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির সুযোগ
নবায়নযোগ্য জ্বালানিও ফেনীর জন্য সম্ভাবনাময় একটি ক্ষেত্র। বিশেষ করে জেলার উপকূলীয় অঞ্চলে সৌর ও বায়ুশক্তি ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় রেখে এসব সম্ভাবনাকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে।
প্রয়োজন সুশাসন ও সমন্বিত পরিকল্পনা
উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেবল অর্থের অভাব নয়; সুশাসন ও পরিকল্পনার ঘাটতিও বড় বাধা। উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থের পরিবর্তে জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রকল্প গ্রহণের আগে বাস্তবসম্মত সমীক্ষা, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা থাকা জরুরি। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
ফেনীর উন্নয়নে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, কৃষক, পেশাজীবী, তরুণ সমাজ ও নাগরিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। একটি জেলার উন্নয়ন শুধু সরকারি প্রকল্পের ওপর নির্ভর করে না; স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই উন্নয়নও সম্ভব নয়।
ফেনীকে এগিয়ে নিতে হলে প্রথমেই সমস্যাগুলোকে অস্বীকার না করে বাস্তবভাবে চিহ্নিত করতে হবে। নদী ও খাল রক্ষা, জলাবদ্ধতা নিরসন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, যানজট কমানো, কৃষি সংরক্ষণ, শিল্পায়ন, কারিগরি শিক্ষা ও কর্মসংস্থান—এসব বিষয়কে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, একটি সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
ফেনী এমন একটি জেলা, যেখানে সংকটের পাশাপাশি সম্ভাবনার পরিমাণও কম নয়। সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ প্রশাসন, জবাবদিহি ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে ফেনী দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি আধুনিক শিল্প, কৃষি, বাণিজ্য ও লজিস্টিকস কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
প্রশ্ন হলো—ফেনী সেই সম্ভাবনাকে কতটা কাজে লাগাতে পারবে? উত্তর নির্ভর করছে আগামী দিনের পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্তের ওপর। ফেনীর উন্নয়ন কেবল নতুন ভবন, রাস্তা বা সেতু নির্মাণে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রয়োজন এমন একটি উন্নয়ন দর্শন, যেখানে মানুষের জীবনমান, পরিবেশ, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজনকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে। তাহলেই ফেনী শুধু সম্ভাবনার জেলা হিসেবে নয়, বাস্তব উন্নয়নের একটি সফল উদাহরণ হিসেবেও দেশের মানচিত্রে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
ভোরের আকাশ/সু.পা