ডান পাশ অচল, বাম হাতে লিখে এইচএসসি পাস

জন্মগত শারীরিক প্রতিবন্ধকতা। ডান হাত ও ডান পা স্বাভাবিকভাবে কাজ করে না। এর মধ্যে মাথায় টিউমার, চলছে চিকিৎসা। শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতিদিন বেশি পড়াশোনা করাও সম্ভব হতো না। তবু দমে যায়নি ১৮ বছর বয়সী আবু কায়েস। বাম হাতে লিখেই এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে সে।
কুমিল্লার তিতাস উপজেলার জগতপুর গ্রামের আবু কায়েস গাজীপুর খান সরকারি মডেল বহুমুখী হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ ২.৫৮ পেয়ে এইচএসসি পাস করেছে। এর আগে ২০২৪ সালে জগতপুর সাধনা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ২.৪৪ পেয়েছিল সে।
আবু কায়েসের বাবা হাফেজ আক্তার হোসেন পেশায় একজন ইমাম। মা মোসাম্মৎ হালিমা বেগম একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা। এক ভাই ও এক বোনের মধ্যে সে ছোট।
আবু কায়েস বলে, “আমি ডান হাতে লিখতে পারি না। বাম হাতেই আমার সব কাজ করতে হয়। এ ছাড়া আমার মাথায় টিউমার আছে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকলেও পড়াশোনার প্রতি আমার আগ্রহ কখনো কমেনি। নানা প্রতিকূলতা ও সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নিজের আগ্রহ ও ইচ্ছাশক্তি থেকেই পড়াশোনা চালিয়ে গেছি। ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে চাই। আমার মতো অন্য প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরাও যেন কোনো বাধাকে ভয় না পেয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যায়, সেই প্রত্যাশা করি।”
তার মা মোসাম্মৎ হালিমা বেগম বলেন, “আমার ছেলে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মানুষের সামনে যেতে ভয় পেত। হাইস্কুলে ভর্তির পর ধীরে ধীরে সে মানুষের সঙ্গে মিশতে শিখেছে। এখন আল্লাহর রহমতে সমাজের সবার সঙ্গে চলাফেরা করতে পারে। আমি একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা। পুরো সংসারের দায়িত্ব আমার ওপর। এর পাশাপাশি ছেলের চিকিৎসাও চালিয়ে যেতে হচ্ছে। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি।”
কলেজের প্রভাষক মাহফুজুল ইসলাম সাইমুম বলেন, “আবু কায়েসকে অনেক পরিশ্রম ও সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে পড়াশোনা করতে হয়েছে। সে সমাজসেবা অধিদপ্তর কর্তৃক সনদপ্রাপ্ত বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থী। তার এই প্রচেষ্টা অন্য শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণা হতে পারে।”
কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, “প্রথম দিকে ক্লাসে তাকে কোনো প্রশ্ন করলে সে কিছুটা অস্বস্তিবোধ করত। পরবর্তী সময়ে আমরা তাকে বিভিন্নভাবে উৎসাহিত করলে ধীরে ধীরে সে প্রশ্ন করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতে শুরু করে। তার মধ্যে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও শেখার আগ্রহ ছিল প্রবল। তার বিশেষ একটি গুণ হলো, আমরা যেভাবেই কোনো বিষয় বুঝিয়ে দিতাম, সে তা শেখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করত। মূলত তার নিজের আগ্রহ, শিক্ষকদের প্রচেষ্টা এবং পরিবারের সহযোগিতা; এই তিন পক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই তার এই সাফল্য এসেছে।”
গাজীপুর খান সরকারি মডেল বহুমুখী হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “বাম হাতে লিখে আবু কায়েসের উত্তীর্ণ হওয়া প্রশংসনীয়। বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকরা তাকে সার্বিক সহযোগিতা করেছেন। ভবিষ্যতেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।”
ভোরের আকাশ/সু.পা