ফ্রিজে কোন খাবার কতদিন রাখবেন এবং ঝুঁকিপূর্ণ খাবার কি কি?

বিশ্বের সাথে তালমিলিয়ে দেশ এগিয়ে চলেছে। দিন মজুর থেকে সর্বোচ্চ বিত্তশালী পরিবার পর্যন্ত সবাই যেন সুখ সাচ্ছন্দময় জীবণ কাটাতে আপন পরিবার ঢেলে সাজাতে ব্যস্ত সময় পার করছে।
তাইতো অতি দরিদ্র থেকে হতদরিদ্র,নিম্ন আয় থেকে মধ্যবিত্ত এবং সার্বোচ্চ পরিবারেও এখন যে জিনিসটি দৃশ্যমান তাহল ফ্রিজ। ফ্রিজ ছাড়া এখনকার দিনে আমাদের জীবন যেন প্রায় প্রায় অচল। তবে সঠিক নিয়মে সংরক্ষণ না করলে ফ্রিজে রাখা খাবারের পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়ে যায়।এমনকি বিষাক্তও হয়ে যেতে পারে খাবার।
ফ্রিজে কাঁচা খাবার রাখার পদ্ধতি একরকম। আর রান্না করা খাবার সংরক্ষণের পদ্ধতি অন্য রকম। অনেকেরই জানা নেই যে রান্না করা খাবার কত দিন পর্যন্ত ফ্রিজে রাখা যায়। চলুনজেনে নেই, আকিজ কলেজ অব হোম ইকোনমিকসের খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রাফাত ফারাহ রশীদের কাছ থেকে কোন খাবার কত দিন পর্যন্ত ফ্রিজে
সংরক্ষণ করে খাওয়া যায়।
আমাদের সবারই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ভাত থাকে। অনেকেই আবার বেঁচে যাওয়া ভাত ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখেন। পরে আবার তা বের করে গরম করে খান। ভাতের মধ্যে স্টার্চের ব্যাকটেরিয়া উপস্থিত থাকে। তাই রান্না করার ১ দিনের
মধ্যেই ভাত খেয়ে ফেলা উচিত। ভাতের মতো রুটিও বেঁচে গেলে অনেকেই ফ্রিজে রাখেন। রুটিও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে খেয়ে ফেলতে হবে।
কাঁচা ফল ও সবজি দিয়ে তৈরি সালাদ বেশি হয়ে গেলে অনেকেই ফ্রিজে রেখে দেন। কাঁচা সালাদ ফ্রিজে রাখলে ব্যাকটেরিয়ায় সংক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। তাইতো কাটার ১ থেকে দু’ঘণ্টার মধ্যে সালাদ খেয়ে ফেললে
ভালো। পাস্তা যদি চিজ ও সস দিয়ে তৈরি করা হয়, তাহলে কখনো ফ্রিজে রাখবেন না। পাস্তা সেদ্ধ করে আলাদাভাবে ফ্রিজে রাখুন। রান্না করা পাস্তা ফ্রিজে রাখলে তা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
ফ্রিজে খাবার রাখুন বক্সে ভরে :
বেশ কয়েক দিনের জন্য একবারে ডাল রান্না করে ফ্রিজে সংরক্ষণ করেন কমবেশি সবাই। সে ক্ষেত্রে বাতাস ঢুকতা রবে না, এমন বাক্সে ডাল সংরক্ষণ করতে হবে। পরবর্তী সময় বের করলেও ঠিক যতটুকু খাবেন ততটুকুই গরম করতে হবে। বাকিটা আবারও তুলে রাখুন ফ্রিজে। ৩ দিন পর্যন্ত ডাল ফ্রিজে রাখা যাবে।
সবজির তরকারি ৩ দিনের বেশি ফ্রিজে রাখা উচিত নয়।তবে চেষ্টা করতে হবে দু’দিনেই যেন শেষ হয়ে যায়। মাছ-মাংসে প্রোটিনের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। তাই এসব খাবারও রান্না করা অবস্থায় ১-২দিনের বেশি ফ্রিজে
রাখা উচিত নয়। তবে অনেকে রান্না করা মাছ-মাংস ১ বেলার মতো করে আলাদা আলাদা বাক্সে রাখেন। এভাবে রাখা খাবারও সর্বোচ্চ ১৫ দিনের মধ্যে খেয়ে ফেলা খুবি ভালো।
ডিপ ফ্রিজ অথবা ফ্রিজে রাখা খাবার:
ডিপ ফ্রিজে সাধারণত কাঁচা মাছ বা মাংস রাখা হয়। ফ্রিজের এই অংশের তাপমাত্রা ১ ডিগ্রির নিচে রাখা হয়। তাই ডিপ ফ্রিজে খাবারের পুষ্টিমান আনুপাতিকহারে অনেকটাই বজায় থাকে।মাছ ভালো করে ধুয়ে, টুকরা করে যতটুকু একবারে রান্না করা হবে, ততটুকুন করে বায়ুরোধী প্যাকেটে রেখে দিতে হবে। এতে করে স্বাদ ও পুষ্টিমান বজায় থাকবে অনেকটাই। আর এভাবে এক থেকে দু’মাস রাখা যাবে ফ্রিজে।
মুরগি ভালো করে পরিষ্কার করে রাখলে ৬ মাস পর্যন্ত রাখা যায় ফ্রিজে। তবে ১ মাসের মধ্যেই খেয়ে ফেলা ভালো। গরু বা খাসির মাংস না ধুয়ে রক্তটা ভালো করে মুছে নিয়ে রাখতে হবে ফ্রিজে । ১ বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা সম্ভব।
তবে ৬ মাসের মধ্যে খেয়ে ফেলাটাই ভালো।
অনেকেই শীতের সবজি সারা বছরের জন্য ফ্রিজে সংরক্ষণ করি। সেক্ষেত্রে হালকা ভাপিয়ে নিয়ে বায়ুরোধী বক্সে বা প্যাকেটে রাখলে বছর খানেক ভালো থাকলেও পুষ্টিগুন এবং স্বাদ অনেকটাই নষ্ট হবে।
খাবার ফ্রিজে ভালো রাখার উপায়:
রন্ধনবিশেষজ্ঞ সিতারা ফেরদৌস জানিয়ে দিলেন ফ্রিজে খাবার ভালো রাখার কিছু উপায়: খাবার ফ্রিজে সংরক্ষণ করতে অবশ্যই বায়ুরোধী পাত্র বা প্যাকেট ব্যবহান করুন। খাবার ওপরের তাকগুলোয় রাখুন। কারণ, সেখানে খাবার বেশি বাতাস পায় এবং ঠান্ডা থাকে। প্রথমে যে খাবারগুলো রাখা হয়েছে, সেগুলো আগে খেয়ে নিন।
নিয়ম মেনে ফ্রিজে মাংস রাখুন:
কাঁচা খাবার এবং রান্না করা খাবার অবশ্যই আলাদা তাকে রাখতে হবে। ফ্রিজের দরজা খোলার আগে ঘরে ফ্যান চালু থাকলে বন্ধ করে নিন। ফ্যানের বাতাস ফ্রিজের ভেতরে ঢুকে খাবারে দ্রুত ব্যাকটেরিয়া তৈরি করতে সহায়তা করে। যদি ফ্রিজের দরজা বারবার খোলা ও বন্ধ করা হয়, তাহলে খাবার দ্রুত নষ্ট হবে। রেফ্রিজারেটরের মান বা অবস্থার ওপরও নির্ভর করে রেফ্রিজারেটরে খাবার কত দিন ভালো থাকবে। ফ্রিজের কম্প্রেশর যদি ভালো না থাকে, তাহলে খাবার দ্রুত নষ্ট হবে। ফ্রিজে খাবার সব সময় ঢেকে রাখুন,ফ্রিজে সব সময় এক টুকরা কাটা লেবু রাখলে ও মাঝেমধ্যে বেকিং সোডা মেশানো পানি দিয়ে ফ্রিজ মুছে নিলে এক খাবারের গন্ধ অন্য খাবারে প্রবেশ করবে না। এ কারণে ফ্রিজে দুর্গন্ধও
হবে না।
ঝুঁকিপূর্ণ খাবার:
ভাত: ফ্রিজে রাখা ভাতে ব্যাসিলাস সিরিয়াস নামক ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে, যা ডায়রিয়া ও বমির কারণ হয়, তাই ২ দিনের মধ্যে খাওয়া ভালো। কাটা পেঁয়াজ: কাটা পেঁয়াজ ফ্রিজে রাখলে ব্যাকটেরিয়া জন্মানোর ঝুঁকি থাকে, তাই কম রাখা উচিত।
যেসব খাবার ফ্রিজে রাখা উচিত নয়: আলু, টমেটো, পেঁয়াজ (পুরো), রসুন, মধু, শসা ইত্যাদি ফ্রিজে রাখলে স্বাদ ও মান নষ্ট হয় বা ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে।
পুনরায় গরম করা: ফ্রিজ থেকে বের করা খাবার (বিশেষ করে ভাত) খাওয়ার আগে ভালোভাবে গরম করতে হবে (পুরোপুরি গরম হওয়া পর্যন্ত)।
যেভাবে বাঁচাবেন:
দ্রুত ঠান্ডা করুন: রান্না করা খাবার ২ ঘণ্টার মধ্যে ঠান্ডা করে ফ্রিজে রাখুন।
পর্যাপ্ত পরিমাণে রান্না করুন: অতিরিক্ত রান্না করা খাবার এড়ানো।
বারবার প্রিজে রখা খাবার বের করা থেকে বিরত থাকুন: এতে তাপমাত্রার পরিবর্তন হয় ও ব্যাকটেরিয়া বাড়ে।
ভোরের আকাশ/মো.আ.