প্রত্যাহার আদেশের পর বিচারকের এজলাসে ওসি নোমান, তদন্তে পুলিশ

ফেনীর দাগনভূঞা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফয়জুল আজিম নোমানকে গত ৯ আগস্ট দায়িত্ব পালনে অযোগ্য ঘোষণা করে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন জেলার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এ এন এম মোর্শেদ খান। এর তিন দিন পর বুধবার (১২ আগস্ট) ওই বিচারকের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে এজলাসেই ‘প্রত্যাখ্যাত’ হয়েছেন ওসি নোমান।
আদালতসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, বুধবার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারক এ এন এম মোর্শেদ খানের এজলাসে হঠাৎ প্রবেশ করেন ওসি নোমান। এ সময় তিনি তিনবার স্যালুট দিয়ে বিচারকের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন। বিষয়টি নজরে এলে বিচারক আদালতের স্টেনোগ্রাফারের কাছে ওই ব্যক্তির পরিচয় জানতে চান।
পরে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর বিচারক ওসি নোমানকে উদ্দেশ করে বলেন, “আপনি এখানে কেন এসেছেন? আপনার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কোনো সম্পর্ক নেই। ইতিমধ্যে আপনাকে প্রত্যাহারের আদেশ দেওয়া হয়েছে। আদালতের অর্ডার অর্ডারই।” এরপর এজলাস থেকে বেরিয়ে যান ওসি নোমান।
সূত্রটি আরও জানায়, বিচারক এজলাসে ওঠার আগে ওসি নোমান তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন। তবে আদালতসংশ্লিষ্টরা অনুমতি ছাড়া বিচারকের সঙ্গে দেখা করা যাবে না বলে তাকে জানান। পরে বিচারক এজলাসে ওঠার পর ওসি হঠাৎ সেখানে প্রবেশ করে স্যালুটের মাধ্যমে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন।
ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট সাহাব উদ্দিন আহমেদ বলেন, “দাগনভূঞা থানার ওসি বিচারকের এজলাসে প্রবেশ করেছেন বলে শুনেছি।”
এ বিষয়ে ফেনী জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) প্রত্যুষ কুমার মজুমদার বলেন, “ওসিকে প্রত্যাহার ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে আদালতের আদেশের পত্র হাতে পেয়েছি। এ বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এর আগে, গত ৯ আগস্ট দেওয়া আদালতের আদেশে বলা হয়, দাগনভূঞার মমারিজপুর এলাকার ২৪ বছর বয়সী এক নারী তাঁর স্বামীসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে যৌতুকের দাবিতে মারধর ও গুরুতর আঘাতের অভিযোগ করেন। এ ঘটনায় থানায় মামলা করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে তিনি আদালতে অভিযোগ করেন।
অভিযোগকারীর শারীরিক পরীক্ষা, তাঁর জবানবন্দি এবং উপস্থাপিত কাগজপত্র পর্যালোচনা করে আদালত অভিযোগটি এজাহার হিসেবে গ্রহণ করে তদন্তের প্রয়োজনীয়তা দেখতে পান। পরে অভিযোগটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করে তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) দায়িত্ব দেওয়ার ব্যবস্থা করতে দাগনভূঞা থানার ওসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
আদালতের আদেশে আরও বলা হয়, ওই নারীর চিকিৎসার কাগজপত্রে মাথায় আঘাতসহ বিভিন্ন শারীরিক জখমের কথা উল্লেখ রয়েছে। গুরুতর আহত একজন নারীকে পুলিশ উদ্ধারের পরও তাঁর অভিযোগ কেন মামলা হিসেবে নেওয়া হয়নি, তা বোধগম্য নয় বলে আদালত মন্তব্য করেন।
শুনানির সময় আইনজীবীরা একই থানায় ২২ বছর বয়সী আরেক নারীকে যৌতুকের দাবিতে হত্যার অভিযোগে করা একটি মামলাও গ্রহণ না করার বিষয় আদালতের নজরে আনেন। ওই নারীকে হত্যার পর ঝুলিয়ে রাখার অভিযোগ করা হলেও থানায় মামলা নেওয়া হয়নি বলে আইনজীবীরা জানান।
আদালত আদেশে উল্লেখ করেন, পৃথক দুটি ঘটনার অভিযোগ মামলা হিসেবে গ্রহণে অস্বীকৃতির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট অভিযোগ, আইনজীবীদের বক্তব্য ও সংযুক্ত কাগজপত্র পর্যালোচনায় গুরুতর বলে প্রতীয়মান হয়েছে। এতে ওই কর্মকর্তার থানায় দায়িত্ব পালনের অযোগ্যতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
এ অবস্থায় দাগনভূঞা থানার ওসিকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার, পৃথক দুটি ঘটনায় মামলা নিতে অস্বীকৃতির বিষয় তদন্ত এবং তাঁর বিরুদ্ধে যথাযথ বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেন আদালত।
ভোরের আকাশ/সু.পা