১০ টাকায় ছবি তুলে মাসে ২০ হাজার টাকা করে দুই তরুণের আয়

সবুজের বুক চিরে এগিয়ে গেছে আঁকাবাঁকা পিচঢালা সড়ক। দুই পাশে সারি সারি তালগাছ, গাছের ফাঁক দিয়ে উঁকি দেওয়া আলো আর খোলা আকাশ—সব মিলিয়ে প্রকৃতির এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। এই সৌন্দর্যের টানে প্রতিদিনই নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার ঘুঘুডাঙ্গা গ্রামের তালতলী সড়কে ছুটে আসেন প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুরা।
আর পর্যটকদের সেই আনন্দঘন মুহূর্ত ক্যামেরায় বন্দি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন দুই তরুণ মঞ্জুরুল ইসলাম ও রায়হান। প্রতিটি ছবি মাত্র ১০ টাকায় তুলে তাঁরা মাসে গড়ে প্রায় ২০ হাজার টাকা আয় করছেন।
নিয়ামতপুর উপজেলার হাজিনগর ইউনিয়নের ঘুঘুডাঙ্গা গ্রামে অবস্থিত তালতলী সড়কটি প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ। সড়কের দুই পাশে সারিবদ্ধ কয়েকশ তালগাছ জায়গাটিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র সৌন্দর্য। পরিবার-পরিজন, বন্ধু কিংবা প্রিয়জনদের সঙ্গে এখানে ঘুরতে আসেন নানা বয়সী মানুষ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি অনেকেই স্মৃতি ধরে রাখতে ছবি তোলেন। তাঁদের সেই চাহিদা পূরণ করেই নিজেদের কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করেছেন মঞ্জুরুল ও রায়হান।
মঞ্জুরুল ইসলাম প্রায় দুই বছর ধরে তালতলী সড়কে ফটোগ্রাফির কাজ করছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কাজ শুরুর প্রথম দিনেই ছবি তুলে ৮০০ টাকা আয় করেছিলেন। প্রথম উপার্জনের সেই টাকা বাড়িতে নিয়ে যান তিনি। বর্তমানে প্রতিদিন তাঁর সর্বনিম্ন আয় প্রায় ৫০০ টাকা। তবে ছুটির দিন, পর্যটকদের ভিড় ও বিভিন্ন উৎসবের সময় আয় আরও বেড়ে যায়।
অন্যদিকে, রায়হানের ফটোগ্রাফার হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে স্বপ্ন, জেদ ও প্রতিকূলতা পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার গল্প। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মাত্র ১৪ বছর বয়সে চিকিৎসার জন্য পাশের উপজেলা নজিপুরে যাওয়ার পথে একটি শুটিং দেখতে পান তিনি। কৌতূহল থেকে ক্যামেরাম্যানের কাছে গিয়ে ক্যামেরা সম্পর্কে জানতে চান। কিন্তু তখন তাঁকে বলা হয়েছিল, এসব বোঝার বয়স তাঁর হয়নি, আরও বড় হতে হবে। একপর্যায়ে তাঁকে শুটিংয়ের স্থান থেকেও বের করে দেওয়া হয়।
সেদিনের সেই ঘটনা রায়হানের মনে জেদ তৈরি করে। বাড়ি ফিরে মাকে বলেছিলেন, একদিন তিনিও ক্যামেরা কিনবেন। এরপর মোবাইল ফোনে বন্ধুদের নিয়ে মজার ভিডিও তৈরি করে ইউটিউবে প্রকাশ করতে শুরু করেন। কখনো ক্যামেরা ভাড়া করেও শুটিং করতেন।
রায়হান জানান, ক্যামেরা কেনার কথা বললে পরিবারের পক্ষ থেকে টাকা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হতো। একপর্যায়ে অভিমান করে বাড়ি ছেড়ে চলে যান তিনি। পরে পরিবার তাঁকে ক্যামেরা কিনে দেয়। সেই ক্যামেরাকে সঙ্গী করেই ধীরে ধীরে ঘুঘুডাঙ্গার তালতলী সড়কে ফটোগ্রাফির কাজ শুরু করেন।
রায়হানের দাবি, প্রায় চার বছর ধরে তিনি এই সড়কে ছবি তোলার কাজ করছেন। কাজ শুরুর প্রথম দুই দিনেই পাঁচ হাজার টাকা আয় করেছিলেন। উপার্জনের সেই টাকা মায়ের হাতে তুলে দিয়েছিলেন তিনি। ঈদের সময় এক দিনে সর্বোচ্চ আট হাজার টাকা আয় করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর। বর্তমানে ছবি তুলে মাসে গড়ে প্রায় ২০ হাজার টাকা আয় করেন রায়হান।
তালতলী সড়কে ঘুরতে আসা পর্যটক রাব্বি বলেন, এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাঁর মনকে আনন্দে ভরিয়ে দেয়। সেই স্মৃতি ধরে রাখতে এক দিনেই প্রায় ১৫টি ছবি তুলেছেন তিনি। তাঁর মতে, এখানে ফটোগ্রাফার থাকায় সহজেই সুন্দর মুহূর্তগুলো ছবিতে ধরে রাখা যায়। মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় এমন ছবি তোলা সম্ভব নয় বলেও মনে করেন তিনি।
প্রতিটি ছবি মাত্র ১০ টাকায় তোলার সুযোগ থাকায় পর্যটকেরা স্বল্প খরচেই ভ্রমণের স্মৃতি ধরে রাখতে পারছেন। অন্যদিকে, পর্যটকদের এই চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের আয়ের পথ তৈরি করেছেন দুই তরুণ। তাঁদের এই উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষুদ্র কর্মসংস্থানেরও একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে ঘুঘুডাঙ্গার তালতলী সড়কটি স্থানীয়দের পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকার ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছেও পরিচিত হয়ে উঠছে। তবে এই সৌন্দর্য ধরে রাখতে প্রয়োজন পরিকল্পিত পরিচর্যা ও সংরক্ষণ। পর্যটক ও স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সড়কটির সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় উন্নয়ন করা হবে। পাশাপাশি সারিবদ্ধ তালগাছগুলো রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসন কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
স্থানীয়দের মতে, তালগাছগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা গেলে জায়গাটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রাখার পাশাপাশি পর্যটকদের আকর্ষণও বাড়বে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান ও আয়ের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
মঞ্জুরুল ইসলাম ও রায়হানের গল্প তাই শুধু ছবি তুলে অর্থ উপার্জনের নয়; এটি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন, প্রতিকূলতা পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়া এবং পছন্দের কাজকে জীবিকায় রূপ দেওয়ার গল্প। তালতলী সড়কের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেমন পর্যটকদের মুগ্ধ করছে, তেমনি সেই সৌন্দর্য ক্যামেরায় বন্দি করে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ছেন এই দুই তরুণ।
ভোরের আকাশ/সু.পা