বন্যার পানি নামলেও রয়ে গেছে ধ্বংসস্তূপ
বন্যায় বিপর্যস্ত খাগড়াছড়ি, বন্যার পানি নামলেও রয়ে গেছে ধ্বংসস্তূপ

বন্যার পানি নেমে গেছে। নদী-ছড়া ফিরে গেছে স্বাভাবিক ধারায়। কিন্তু খাগড়াছড়ির পাহাড়-সমতলের মানুষের জীবন থেকে এখনো কাটেনি দুর্যোগের ছাপ। বিস্তীর্ণ জনপদজুড়ে পড়ে আছে কাদামাটি, ধ্বংসস্তূপ, ভাঙা ঘরবাড়ি আর নষ্ট হয়ে যাওয়া ফসলের জমি। কোথাও পাহাড়ধসে বিধ্বস্ত বসতভিটা, কোথাও পানিতে পচে গেছে আমনের বীজতলা, আবার কোথাও সবজিখেত পরিণত হয়েছে কাদার স্তূপে। কয়েক দিন আগেও যে জমিতে নতুন স্বপ্ন বুনেছিলেন কৃষকরা, সেখানে এখন শুধু ক্ষতির হিসাব আর অনিশ্চয়তার দীর্ঘশ্বাস।
টানা নয় দিনের ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও আংশিক পাহাড়ধসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলা। তবে জেলার নয়টি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বন্যার ক্ষতচিহ্ন এখনো স্পষ্ট। শত শত বসতঘর প্লাবিত হয়েছে, বহু পরিবারকে আশ্রয়কেন্দ্রে মানবেতর জীবন কাটাতে হয়েছে। কোথাও পাহাড়ধসে ঘরবাড়ি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে, আবার কোথাও রাস্তা ভেঙে বিচ্ছিন্ন হয়েছে যোগাযোগ। পানি নেমে যাওয়ার পরও অনেক পরিবার এখন ঘরবাড়ি পরিষ্কার, বসবাসযোগ্য পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং নতুন করে জীবন শুরু করার সংগ্রামে ব্যস্ত।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বন্যায় জেলার ৭ হাজার ৩৪৪ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রায় ৩০০ হেক্টর কৃষিজমির ফসল সম্পূর্ণ বা আংশিক নষ্ট হয়েছে। এতে কৃষি খাতে ১১ কোটি টাকারও বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমনের বীজতলা, আউশ ধান, গ্রীষ্মকালীন বিভিন্ন সবজি এবং পেঁপেসহ নানা ফলের বাগান।
দীঘিনালা উপজেলার কৃষক মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন বলেন, পানি নেমে গেছে, কিন্তু জমিতে আর কিছুই নেই। আমনের বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে, সবজি ক্ষেতও শেষ। নতুন করে চাষ করতে হলে বীজ, সার ও অর্থ,সবকিছুরই প্রয়োজন। একই উপজেলার কৃষক শান্তি বালা চাকমা বলেন, বন্যায় শুধু ফসল নয়, আমাদের পুরো মৌসুমের স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে। সরকারি সহায়তা ছাড়া আবার শুরু করা কঠিন।কমলছড়ি ইউনিয়নের কৃষক প্রীতিময় চাকমা বলেন, দেড় একর জমিতে মরিচ, ঢেঁড়স ও শাকসবজি করেছিলাম। কয়েক ঘণ্টার পাহাড়ি ঢলেই সব শেষ হয়ে গেছে। এখন ঋণ শোধ করব কীভাবে, সেই চিন্তায় আছি।
বন্যায় শুধু কৃষিই নয়, ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে অসংখ্য বসতবাড়ি। অনেক বাড়িতে কোমরসমান পানি ঢুকে আসায় পরিবারগুলোকে রাতের অন্ধকারে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বের হতে হয়েছে। পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে অনেকেই কয়েক দিন আশ্রয়কেন্দ্রে কাটিয়েছেন। পানি নেমে বাড়ি ফিরলেও ভাঙা দেয়াল, নষ্ট আসবাবপত্র ও কাদায় ভরা ঘর পরিষ্কার করতেই তাদের দিনের বেশিরভাগ সময় চলে যাচ্ছে।
জেলা সদরের সবুজবাগ এলাকার বাসিন্দা মো. রফিক বলেন, পাহাড়ধসে আমাদের ঘরের একাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিবার নিয়ে এখনও নিরাপত্তাহীনতায় আছি। দ্রুত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা হলে স্বস্তি পাব। শালবন এলাকার বাসিন্দা আমেনা বেগম বলেন, প্রবল বৃষ্টির রাতে ছোট ছোট সন্তান নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে হয়েছিল। এখন বাড়িতে ফিরেছি, কিন্তু পাহাড়ের নিচে বসবাস নিয়ে আতঙ্ক কাটছে না।
খাগড়াছড়ি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, বন্যায় জেলার প্রায় ৩০০ হেক্টর কৃষিজমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ৭ হাজার ৩৪৪ জন কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন এবং আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১১ কোটি টাকারও বেশি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। সরকারি বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত সহায়তা দেওয়া হবে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের উন্নতমানের বীজ ও রাসায়নিক সার বিতরণ করা হবে, যাতে তারা দ্রুত পুনরায় আবাদে ফিরতে পারেন।
খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন, টানা নয় দিনের ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও আংশিক পাহাড়ধসের সময় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলার ১৫০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। বন্যার পানি কমে যাওয়ার পর আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলো নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে গেছে। আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষদের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল এবং বাড়িতে অবস্থানকারী ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছেও ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ক্ষয়ক্ষতির সঠিক মূল্যায়ন করে পুনর্বাসন নিশ্চিত করা। যাদের ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যাচাই-বাছাই শেষে তাদের সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে, যাতে কোনো ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হন।
কৃষি বিভাগ ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, তাৎক্ষণিক বন্যা পরিস্থিতির অবসান হলেও এখন শুরু হয়েছে পুনরুদ্ধারের কঠিন অধ্যায়। কৃষকদের হাতে দ্রুত কৃষি প্রণোদনা, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পুনর্বাসন, পাহাড়ধসে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ভোরের আকাশ/ইউএম