২৬৪ কোটির গৃহকর নোটিশে তোলপাড় বন্দরে

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বার্ষিক গৃহকর এক লাফে প্রায় ২২০ কোটি টাকা বাড়িয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। নতুন নির্ধারণ অনুযায়ী, এখন থেকে বন্দরকে বছরে ২৬৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা গৃহকর দিতে হবে। এতদিন সংস্থাটি বছরে ৪৫ কোটি টাকা পরিশোধ করে আসছিল। এই সিদ্ধান্তের ফলে দীর্ঘদিনের বিরোধ আবারও প্রকাশ্যে এসেছে।
গত ৩ মে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে অনুষ্ঠিত এক আপিল শুনানি শেষে নতুন গৃহকর নির্ধারণ করা হয়। শুনানিতে মেয়র শাহাদাত হোসেনসহ বন্দর ও সিটি করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পরদিন ৪ মে বন্দর কর্তৃপক্ষকে নতুন কর পরিশোধের নোটিশ পাঠায় চসিক।
চসিকের দাবি, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হলেও বন্দর কর্তৃপক্ষ নতুন নির্ধারিত গৃহকর পরিশোধে নানা জটিলতা তৈরি করছে। সম্প্রতি নগরের একটি হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মেয়র শাহাদাত হোসেন বলেন, চট্টগ্রাম নগরের সড়কগুলোর ধারণক্ষমতা সর্বোচ্চ ১০ টন হলেও বন্দরের ৪০ থেকে ৫০ টনের ভারী যানবাহন নিয়মিত চলাচল করছে। এর ফলে নগরের সড়ক ও সেতুগুলো ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ছে। তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন এসব ক্ষতির জন্য আলাদা ক্ষতিপূরণ দাবি করছে না, কিন্তু আইন অনুযায়ী যে গৃহকর পাওনা, সেটিও বন্দর কর্তৃপক্ষ পরিশোধ করছে না।
গৃহকর নিয়ে দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হলে গত বছরের ১৪ আগস্ট আট সদস্যের একটি যৌথ কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি বন্দরের ১ কোটি ৭৩ লাখ বর্গফুট স্থাপনার বিপরীতে ২৬৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা গৃহকর নির্ধারণ করে। যদিও স্থাপনার আয়তন নিয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ একমত হলেও করের পরিমাণ নিয়ে আপত্তি তোলে।
বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা সিটি করপোরেশনের পাঠানো নোটিশ হাতে পেয়েছে এবং এ বিষয়ে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চলছে। তবে গৃহকর সংক্রান্ত বিরোধের কারণে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে কর পরিশোধ স্থগিত রেখেছে সংস্থাটি। যদিও একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে সবচেয়ে বেশি গৃহকর দিয়ে থাকে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
চসিক সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে করা পঞ্চবার্ষিক পুনর্মূল্যায়নে বন্দরের গৃহকর ১৬০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু বন্দরের আপত্তির পর সাবেক মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরীর আমলে তা কমিয়ে ৪৫ কোটি টাকা করা হয়। পরে ২০২৪ সালের ৩ নভেম্বর দায়িত্ব নেওয়ার পর মেয়র শাহাদাত হোসেন আবারও ১৬০ কোটি টাকা হারে গৃহকর আদায়ের উদ্যোগ নেন।
এরপর নতুন করে যৌথ জরিপ ও আলোচনা শুরু হয়। সেই ধারাবাহিকতায় আট সদস্যের কমিটি বন্দরের স্থাপনার পরিমাণ যাচাই করে নতুন কর নির্ধারণ করে। তবে এ নিয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের আপত্তি অব্যাহত থাকে। কর নির্ধারণের বিষয়ে দিকনির্দেশনা চেয়ে গত ১৩ এপ্রিল নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ।
এর জবাবে গত ২২ এপ্রিল মন্ত্রণালয় জানায়, স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন ২০০৯ এবং মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন (ট্যাক্সেশন) রুলস, ১৯৮৬ অনুযায়ী গৃহকর নির্ধারণের এখতিয়ার সিটি করপোরেশনের। এ বিষয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের কোনো ভূমিকা নেই। একই সঙ্গে মন্ত্রণালয় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে চসিক নির্ধারিত গৃহকর পরিশোধ করে বিষয়টি অবহিত করার নির্দেশ দেয়।
এর আগে ২২ এপ্রিল প্রথম দফায় বন্দর কর্তৃপক্ষকে ২৬৪ কোটি টাকা গৃহকর পরিশোধের নোটিশ দেয় চসিক। পরে এই নির্ধারণের বিরুদ্ধে ২৮ এপ্রিল আনুষ্ঠানিক আপিল করে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
আপিল আবেদনে বন্দর কর্তৃপক্ষ দাবি করে, মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন রুলস ১৯৮৬ অনুসরণ করে সঠিকভাবে গৃহকর নির্ধারণ করা হয়নি। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, যৌথ জরিপে যে পরিমাণ স্থাপনার হিসাব পাওয়া গেছে, সে অনুযায়ী গৃহকর হওয়া উচিত প্রায় ১৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। অথচ বর্তমানে তারা এর তিন গুণেরও বেশি অর্থ পরিশোধ করছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষ আরও উল্লেখ করে, সাধারণত পাঁচ বছর অন্তর গৃহকর পুনর্নির্ধারণ করা হয়। ২০২০ সালের ৬ নভেম্বর ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য ১৬০ কোটি ১৬ লাখ টাকা গৃহকর দাবি করে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। পরে দুই প্রতিষ্ঠানের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সমঝোতার মাধ্যমে ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে বার্ষিক ৪৫ কোটি টাকা গৃহকর নির্ধারণ করা হয়। তাই নতুন করে কর বাড়াতে হলে সেটি ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে কার্যকর হওয়ার কথা বলে দাবি করে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এস এম সরওয়ার কামাল বলেন, শুনানিতে বন্দর কর্তৃপক্ষ আবারও কর পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানায়। তবে বর্তমান বিধি অনুযায়ী নতুন করে পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ নেই। তিনি বলেন, নির্ধারিত গৃহকর নিয়ে আপত্তি থাকলে বিভাগীয় কমিশনারের কাছে আপিল করা যাবে, কিন্তু সেক্ষেত্রে আগে নির্ধারিত করের ৭৫ শতাংশ জমা দিতে হবে।
অন্যদিকে বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্বে) সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, তারা ২৬৪ কোটি টাকার গৃহকরের নোটিশ পেয়েছেন এবং বিধি অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।
ভোরের আকাশ/এনউব