সিডরের ১৮ বছর: এখনো স্বস্তি নেই উপকূলবাসীর

আজ ১৫ নভেম্বর। ২০০৭ সালে এই দিনে মহাপ্রলয়কারী সুপার সাইক্লোন সিডর বাংলাদেশের উপকূলীয় জেলা বরগুনা সহ সমগ্র উপকূলে বিধ্বংসী আঘাত হানে। দেড় যুগ কেটে গেলেও আজও উপকূলবাসী এই প্রলয়ংকরী সিডরের কথা স্মরণ করে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে।
ঘণ্টায় ২৬০ কিলোমিটার বেগে বাতাসের ধাক্কা এবং স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ১০–১২ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস, মানুষের জীবন ও অর্থনীতিকে সম্পূর্ণভাবে বিপর্যস্ত করে।
সিডরের আঘাতে পাথরঘাটা উপজেলায় সরকারি হিসাব অনুযায়ী ১,৪৩৫ জনের প্রাণহানি ঘটে। জলোচ্ছ্বাসে পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বর নদীর পাড়ের ৩০০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ভেঙে ৬৮, ৩৭৯টি ঘরবাড়ি তলিয়ে যায়। ৩৭,০৬৪ একর কৃষিজমি পানিতে ডুবে যায় এবং অসংখ্য জেলে নিখোঁজ হয়। বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী ক্ষয়ক্ষতির পরিসর আরও বিস্তৃত।
মহাপ্রলয়কারী সিডরের পর থেকে উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত অব্যাহত রয়েছে। আইলা, মহাসিন, বুলবুল, আম্পান এবং সর্বশেষ রেমালসহ একের পর এক ঘূর্ণিঝড় পাথরঘাটার মানুষের জীবন ও অর্থনীতিকে হুমকির মুখে ফেলেছে। প্রতিবারই বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এবং শুধু কিছু স্থানে স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। জ্বীনতলা, কাকচিড়া, তাফালবাড়িয়া সহ প্রায় সব সদর ইউনিয়নের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এখনও পর্যাপ্ত সুরক্ষা পায়নি।
উপকূলবাসীর জীবনধারা প্রধানত কৃষি ও মৎস্যচাষের ওপর নির্ভরশীল। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ফলে ঘরবাড়ি, ফসল এবং সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি তাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
মহাপ্রলয়কারী এই দিনটির কথা স্মরণ করে পাথরঘাটা সদর ইউনিয়নের জ্বীনতলা ভাঙন এলাকার বাসিন্দা সেতারা খাতুন (৭৫) বলেন, "যখন আমার বয়স ১৬ বছর তখন আমার বাবা-মা আমাকে এই ভাঙন কবলিত জ্বীনতলা এলাকার বাসিন্দা করিম বেপারীর সাথে বিবাহ দেয়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত এই এলাকায় স্বামী ও ছেলে সন্তান নিয়ে বসবাস করে আসছি। আমি আমার এই বয়সে ছোট বড় ৪০টির মতো ঘূর্ণিঝড় দেখেছি। বিয়ের পরে এখানে আসার পরে যতগুলোই ঘূর্ণিঝড় হতে দেখেছি, তার প্রত্যেকটিতেই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেখেছি এই এলাকাটিকে। কারণ আজ পর্যন্ত এই ভাঙন কবলিত জ্বীনতলা এলাকায় সরকারিভাবে কোনো বেড়িবাঁধ তৈরি হয়নি। এখানে কোনো বেড়িবাঁধ না থাকাই যতবারই ঘূর্ণিঝড় হয়েছে, ততবারই আমাদেরকে তিলে তিলে গড়া ঘরবাড়ি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে দিনের পর দিন পার করতে হয়েছে। আমি ২০০৭ সালের মহাপ্রলয়কারী ঘূর্ণিঝড় সিডরে আমার নিজের বসতঘরসহ অন্তত শতাধিক বসতঘর সম্পূর্ণ লন্ডভন্ড হতে দেখেছি। কয়েক মিনিটের ঘূর্ণিঝড়টিতে এই এলাকায় প্রাণহানি হয়েছিল কয়েক শতাধিক মানুষ ও গবাদি পশুর। ঘূর্ণিঝড় শব্দটি শুনলে এখনও এই এলাকার অনেক মানুষ হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন।"
দেড় যুগ পরও মহাপ্রলয়কারী সিডরের স্মৃতি উপকূলবাসীর মনে অম্লান। প্রতি বর্ষায় ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাবনা মানুষের মধ্যে নতুন আতঙ্ক তৈরি করে। স্থানীয় অবকাঠামো এখনও ঝুঁকিপূর্ণ, যা ভবিষ্যতে আরও ক্ষতি ঘটানোর সম্ভাবনা বহন করে। সরকারের সক্রিয় উদ্যোগ, টেকসই অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রস্তুতি ব্যবস্থা সমন্বিত না হলে, উপকূলবাসীরা প্রতিটি ঝড়কে পুনরায় বিপর্যয় হিসেবে অভিজ্ঞতা করতে বাধ্য।
উপকূলীয় এলাকার বেড়িবাঁধের স্থিতি এবং জলোচ্ছ্বাস প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব এই অঞ্চলকে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের অবস্থা এবং পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকায় ঘূর্ণিঝড়ের সময় ঘরবাড়ি, ফসল এবং প্রাণহানির সম্ভাবনা বারবার বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয় এবং কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগে কিছু বাঁধ নির্মাণ হলেও এখনও অনেক এলাকা সঠিক সুরক্ষা পাচ্ছে না।
পাথরঘাটার ইতিহাসে সিডরের ধ্বংসযজ্ঞ শুধুমাত্র অতীতের ঘটনা নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলায় উপকূলীয় নিরাপত্তা, টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ, সতর্কতা ব্যবস্থা এবং জরুরি পরিকল্পনার প্রয়োগ অপরিহার্য। সরকারের উদ্যোগ এবং স্থানীয় প্রস্তুতি সমন্বিতভাবে না থাকলে ভবিষ্যতে ঘূর্ণিঝড়ের কারণে পুনরায় ব্যাপক ক্ষতি ঘটতে পারে।
দেড় যুগ পরও সিডরের শিক্ষা এখনও প্রাসঙ্গিক, যা ভবিষ্যতের ঝুঁকি হ্রাস এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য নির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ভোরের আকাশ/মো.আ.