ফিশারি ঘাটে ইলিশের জোয়ার, কমছে না বাজারদর

কর্ণফুলীর তীর ঘেঁষে চট্টগ্রামের ফিশারি ঘাটে ফিরেছে পুরোনো কর্মচাঞ্চল্য। গভীর সমুদ্র থেকে একের পর এক মাছভর্তি ট্রলার এসে ভিড়ছে ঘাটে। জেলেদের জালে ধরা পড়ছে ঝাঁকে ঝাঁকে রুপালি ইলিশ। ভোর হওয়ার আগেই ট্রলার থেকে মাছ নামানো, বাছাই, ওজন ও নিলাম নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠছে পুরো এলাকা।
কয়েক সপ্তাহ আগেও ঘাটে ইলিশের সরবরাহ তুলনামূলক কম ছিল। ট্রলারের আনাগোনাও ছিল সীমিত। তবে অনুকূল আবহাওয়া ও সমুদ্রে ইলিশের উপস্থিতি বাড়ায় বর্তমানে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। প্রতিদিনই একাধিক ট্রলার ইলিশ নিয়ে ঘাটে ফিরছে। এতে আড়তগুলোতে বেড়েছে বেচাকেনা। কর্মব্যস্ততা বেড়েছে জেলে, আড়তদার, শ্রমিক, পরিবহন ব্যবসায়ী, বরফ ব্যবসায়ীসহ মৎস্য বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের।
তবে ঘাটে সরবরাহ বাড়লেও সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে স্বস্তি ফেরেনি। অবতরণ কেন্দ্রে তুলনামূলক কম দামে ইলিশ বিক্রি হলেও খুচরা বাজারে এসে দাম বেড়ে যাচ্ছে। ফলে জেলেদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি দেখা গেলেও বাজারে ইলিশ কিনতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত ক্রেতারা।
ভোরের আগেই শুরু কর্মযজ্ঞ
রাত পেরিয়ে ভোরের আলো ফোটার আগেই ফিশারি ঘাটে শুরু হয় মাছ নামানোর কাজ। ট্রলার ঘাটে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিকরা মাছের বাক্স ও ঝুড়ি আড়তে নিয়ে যান। সেখানে আকার ও মান অনুযায়ী ইলিশ বাছাই করা হয়। এরপর ওজন শেষে নিলামের মাধ্যমে পাইকারদের কাছে মাছ বিক্রি করা হয়।
ঘাটের বিভিন্ন আড়তে চলে দরদাম ও দর হাঁকাহাঁকি। কোথাও মাছ বাছাই, কোথাও ওজন, আবার কোথাও পাইকারদের সঙ্গে চলছে দাম নিয়ে আলোচনা। সব মিলিয়ে কয়েক ঘণ্টার জন্য পুরো ফিশারি ঘাট পরিণত হচ্ছে কর্মচঞ্চল বাণিজ্যকেন্দ্রে।
প্রতিদিন ফিরছে একাধিক ট্রলার
মৎস্য খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ২০টি ট্রলার ইলিশ নিয়ে ফিশারি ঘাটে ফিরছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে কোনো কোনো দিনে ট্রলারের সংখ্যা আরও বাড়ছে।
এর ফলে ঘাটকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও গতি এসেছে। জেলেদের পাশাপাশি আড়তদার, মাছ কাটার শ্রমিক, পরিবহনকর্মী, বরফ ব্যবসায়ী, প্যাকেজিং ও সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের কর্মব্যস্ততাও বেড়েছে।
জুলাইয়ে চট্টগ্রামে আহরণ ১ হাজার ৫৭২ টন
চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই মাসে চট্টগ্রামের উপকূলীয় ও নদীসংলগ্ন বিভিন্ন এলাকা থেকে মোট ১ হাজার ৫৭২ টন ইলিশ আহরণ করা হয়েছে। এর প্রায় ৮০ শতাংশই এসেছে সমুদ্র অঞ্চল থেকে।
চট্টগ্রাম উপকূল ও সন্দ্বীপ চ্যানেল এলাকায় ইলিশ আহরণের পরিমাণ ছিল বেশি। মৎস্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমুদ্রে ইলিশের বিচরণ বাড়ার পাশাপাশি আবহাওয়া তুলনামূলক শান্ত থাকায় জেলেরা দীর্ঘ সময় মাছ আহরণের সুযোগ পাচ্ছেন।
ঘাটে মণপ্রতি ইলিশ ১৫ থেকে ৭০ হাজার টাকা
ফিশারি ঘাটের আড়তগুলোতে ইলিশের আকার ও ওজনভেদে দামের বড় পার্থক্য রয়েছে। বর্তমানে প্রতি মণ ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১৫ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
মাঝারি আকারের ইলিশের দাম মণপ্রতি ২৪ থেকে ২৫ হাজার টাকার মধ্যে। সে হিসাবে ঘাট পর্যায়েই প্রতি কেজি ইলিশের দাম পড়ছে আনুমানিক ৬২০ থেকে ৬৪০ টাকা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরবরাহ বাড়লেও বড় আকারের ইলিশের চাহিদা বেশি থাকায় আকারভেদে দামে বড় ব্যবধান রয়েছে।
ঘাট থেকে বাজারে গেলেই বাড়ছে দাম
ঘাটে তুলনামূলক কম দামে ইলিশ পাওয়া গেলেও নগরের খুচরা বাজারে গিয়ে দাম বেড়ে যাচ্ছে। পরিবহন, বরফ, আড়তদারি, শ্রমিকের মজুরি, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের বিভিন্ন খরচ যুক্ত হওয়ার কারণে ভোক্তা পর্যায়ে দাম বাড়ছে বলে ব্যবসায়ীদের দাবি।
ব্যবসায়ী মো. রহিম উদ্দিন বলেন, ঘাটে ইলিশের সরবরাহ আগের তুলনায় বেড়েছে। তবে এর পুরো প্রভাব এখনও খুচরা বাজারে পড়েনি। বিভিন্ন পর্যায়ের খরচ যুক্ত হওয়ার পর ভোক্তার হাতে মাছ পৌঁছাতে গিয়ে দাম অনেক বেড়ে যায়।
তিনি জানান, নগরের বাজারগুলোতে বর্তমানে ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রতি কেজি প্রায় ৯০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম কেজিপ্রতি প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা।
এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২ হাজার টাকা কেজি দরে। আর দেড় কেজির বেশি ওজনের বড় ইলিশের দাম কেজিপ্রতি ৩ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
সরবরাহ বাড়লেও ক্রেতার স্বস্তি কোথায়?
ঘাটে ইলিশের সরবরাহ বাড়ায় সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল, খুচরা বাজারেও দাম কমবে। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন এখনও তেমন দেখা যাচ্ছে না।
ক্রেতাদের প্রশ্ন, অবতরণ কেন্দ্রে যদি প্রতি কেজি ইলিশের দাম ৬০০ টাকার আশপাশে থাকে, তাহলে খুচরা বাজারে একই মাছের দাম এত বেশি কেন?
ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, ঘাট থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত ইলিশকে পরিবহন, সংরক্ষণ, শ্রম ও বাজারজাতকরণের একাধিক ধাপ অতিক্রম করতে হয়। এসব ব্যয় যুক্ত হওয়ায় খুচরা বাজারে দাম বেড়ে যায়।
জোয়ার-ভাটার সঙ্গেও রয়েছে ইলিশের সম্পর্ক
মৎস্য কর্মকর্তারা বলছেন, ইলিশের বিচরণ ও আহরণে জোয়ার-ভাটার প্রভাব রয়েছে। অমাবস্যা ও পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার পরিবর্তন ইলিশের চলাচলের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে অনুকূল পরিস্থিতির কারণে সমুদ্রে ইলিশের উপস্থিতি বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। ফলে জেলেদের জালেও তুলনামূলক বেশি মাছ ধরা পড়ছে।
মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তাদের আশা, আবহাওয়া ও সমুদ্রের পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে আগামী দিনগুলোতে ইলিশের সরবরাহ আরও বাড়তে পারে। সরবরাহ ধারাবাহিকভাবে বাড়লে ধীরে ধীরে এর প্রভাব পাইকারি ও খুচরা বাজারেও পড়তে পারে।
কর্মচাঞ্চল্যে ফিরেছে ফিশারি ঘাট
ইলিশের বাড়তি সরবরাহে ফিশারি ঘাটকেন্দ্রিক কর্মজগতেও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে। ট্রলার আসার সঙ্গে সঙ্গে মাছ নামানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন শ্রমিকরা। কেউ মাছের বাক্স বহন করছেন, কেউ বরফ দিচ্ছেন, আবার কেউ আড়তে মাছ সাজিয়ে রাখছেন।
অন্যদিকে পাইকাররা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাছ পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ফলে দীর্ঘ সময় পর ফিশারি ঘাটে ফিরে এসেছে ব্যস্ততার পুরোনো চেহারা।
জেলেদের মুখে স্বস্তি, অপেক্ষায় ভোক্তা
ইলিশের বাড়তি আহরণে জেলেদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। সমুদ্রে বেশি মাছ পাওয়া গেলে ট্রিপপ্রতি আয় বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। একই সঙ্গে আড়তদার ও শ্রমিকদের আয়-রোজগারও বাড়ে।
তবে সেই স্বস্তির পূর্ণ প্রতিফলন এখনও দেখা যাচ্ছে না ভোক্তা পর্যায়ে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, ইলিশের সরবরাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খুচরা বাজারেও দাম কমবে।
চট্টগ্রামের ফিশারি ঘাটে এখন রুপালি ইলিশের জোয়ার। ট্রলার ফিরছে, আড়তে বাড়ছে লেনদেন, শ্রমিকদের ব্যস্ততাও বাড়ছে। তবে সেই জোয়ারের প্রভাব এখনও পুরোপুরি পৌঁছেনি ভোক্তার বাজারে। আগামী দিনগুলোতে সরবরাহ আরও বাড়লে ঘাট ও খুচরা বাজারের দামের ব্যবধান কতটা কমে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
ভোরের আকাশ/জেআ