ফুলপুরে ৫ চিকিৎসক অনুপস্থিত, ময়মনসিংহ মেডিকেলে ৫ নির্দেশনা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর

ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে পাঁচ চিকিৎসককে কর্মস্থলে অনুপস্থিত পেয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল।
এ সময় হাসপাতালের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুরবস্থা, টিকা সংরক্ষণে অব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতিও তার নজরে আসে। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করার পাশাপাশি অনুপস্থিতির কারণ খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। একই দিন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শন করে দালালমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা, সরকারি ওষুধের সরবরাহ, পরিচ্ছন্নতা ও চিকিৎসক-নার্সদের উপস্থিতিসহ সেবার মানোন্নয়নে পাঁচ দফা নির্দেশনা দেন মন্ত্রী।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকাল ৮টার দিকে ফুলপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং দুপুরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আকস্মিক পরিদর্শন করেন তিনি। দুই হাসপাতাল ঘুরে দেখার পাশাপাশি রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং চিকিৎসাসেবার সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নেন। এ সময় উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১৫১ করার পরিকল্পনার কথাও জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
শনিবার সকালে পূর্বঘোষণা ছাড়াই ফুলপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখার একপর্যায়ে হাজিরা খাতা যাচাই করে পাঁচ চিকিৎসককে কর্মস্থলে অনুপস্থিত দেখতে পান বলে জানান তিনি। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রাহাত চৌধুরীকেও কর্মস্থলে পাওয়া যায়নি। অনুপস্থিতির বিষয়টি যাচাই করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন মন্ত্রী।
হাসপাতালের রান্নাঘরের পাশের এলাকায় ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকতে দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। শৌচাগার ও গোসলখানার অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুরবস্থা নিয়েও অসন্তোষ জানান। দীর্ঘ আট মাসেও ড্রেনেজ সমস্যার উন্নতি না হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে দ্রুত পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগ খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেন তিনি।
পরিদর্শনের সময় সরকারি বরাদ্দের টিকা ও ভ্যাকসিন যথাযথভাবে সংরক্ষণ না করে নিচে ফেলে রাখা অবস্থায় দেখতে পান মন্ত্রী। এ ঘটনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে সতর্ক করে নির্ধারিত নিয়মে টিকা সংরক্ষণের নির্দেশ দেন তিনি।
শিশু ওয়ার্ড পরিদর্শন করে ভর্তি শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় শয্যা ও রেক্সিনের চাদরের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন মন্ত্রী। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতির অভাবে রোগীদের বাইরে থেকে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে—এমন সমস্যার বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
ফুলপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৫০ শয্যার হলেও সেখানে রোগীর চাপ, চিকিৎসকসংকট এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির ঘাটতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ সীমিত থাকলে রোগীদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা অন্য হাসপাতালে যেতে হয়। এতে চিকিৎসার ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা শুরুতেও বিলম্ব হতে পারে।
পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, আকস্মিক পরিদর্শনে চিকিৎসকদের অনুপস্থিতিসহ বিভিন্ন অনিয়ম পাওয়া গেছে। এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্বাস্থ্য খাতের বিদ্যমান সংকট কাটিয়ে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে সরকার কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
এ সময় উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর শয্যাসংখ্যা ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১৫১ করার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন মন্ত্রী। পাশাপাশি কিডনি রোগীদের জন্য ডায়ালাইসিস সুবিধা চালু এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান তিনি।
এ ছাড়া ইউনিয়ন সদর এলাকায় বহুতল পরিবার হাসপাতাল এবং পুরোনো তিনটি ওয়ার্ডে পরিবার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসাসেবার সুযোগ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসামগ্রী নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
ফুলপুর পরিদর্শনের পর দুপুরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, মেডিসিন ও সার্জারি ওয়ার্ড ঘুরে দেখেন তিনি। ভর্তি রোগীদের সঙ্গে কথা বলে তাদের চিকিৎসাসেবা ও ভোগান্তির বিষয়ে খোঁজ নেন। পরে হাসপাতালের পরিচালকের কার্যালয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও সেবার মানোন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করেন।
পরিদর্শন শেষে হাসপাতালটিতে পাঁচ দফা নির্দেশনা দেন মন্ত্রী। নির্দেশনাগুলোর মধ্যে রয়েছে—হাসপাতালকে দালালমুক্ত রাখা, সরকারি ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখা, চিকিৎসক-নার্সসহ সংশ্লিষ্ট কর্মীদের সময়মতো উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং জরুরি বিভাগের সেবা উন্নত করা।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের অন্যতম প্রধান সরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান। ময়মনসিংহ ছাড়াও নেত্রকোনা, জামালপুর, শেরপুর, কিশোরগঞ্জসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। ফলে রোগীর চাপ সামলানো, পর্যাপ্ত জনবল ও চিকিৎসাসামগ্রী নিশ্চিত করা এবং সেবার মান বজায় রাখা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে রোগীরা যাতে দালালের খপ্পরে পড়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য না হন, সে জন্য কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। একইভাবে বরাদ্দ করা ওষুধ রোগীদের কাছে পৌঁছানো, চিকিৎসকদের নিয়মিত উপস্থিতি এবং জরুরি বিভাগে দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করাও জরুরি।
দুই হাসপাতাল পরিদর্শনে চিকিৎসকদের উপস্থিতি, পরিচ্ছন্নতা, টিকা সংরক্ষণ, চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা সামনে এসেছে। এখন এসব বিষয়ে মন্ত্রীর দেওয়া নির্দেশনা কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অভিযোগ যাচাই করে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং ঘোষিত উন্নয়ন পরিকল্পনা কতটা কার্যকরভাবে এগোয়, তার ওপরই নির্ভর করবে রোগীদের চিকিৎসাসেবায় বাস্তব পরিবর্তন।
ভোরের আকাশ/আ.র