কক্সবাজার
সমুদ্রসৈকতে পর্যটক বিহীন সুনশান নিরবতা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও আসন্ন পবিত্র রমজান মাসকে ঘিরে দেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজারে দেখা দিয়েছে পর্যটন স্থবিরতা। আজ শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) ভ্যালেন্টাইন ডে স্বাভাবিক অবস্থায় এ সময়ে সমুদ্র সৈকতে পর্যটকদের ভিড় থাকে চোখে পড়ার মতোই। তবে এবার সেই চিত্র ব্যতিক্রম সৈকতের বালুচরে হৃদয় আঁকা কিংবা ভালোবাসার বার্তা লেখার চেনা দৃশ্য চোখে পড়েনি আগের মতো।
পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আসন্ন রমজানকে কেন্দ্র করে ভ্রমণ পরিকল্পনা কমে গেছে। অনেক হোটেল ও গেস্টহাউসে বুকিং ছিল স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কম। ফলে ভালোবাসা দিবসেও প্রত্যাশিত পর্যটক সমাগম হয়নি। তবে যারা এসেছেন, তারা শান্ত পরিবেশে প্রিয়জনের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পেয়েছেন।
শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে সমুদ্র সৈকতের সুগন্ধা, লাবনী ও কলাতলী পয়েন্ট ঘোরে দেখা যায় সুনশান নিরবতা। এসব পয়েন্টে কিছু স্থানীয় বাসিন্দা ছাড়া তেমন পর্যটকের দেখা মিলেনি। সমুদ্র সৈকত ছাড়াও জেলার অন্যান্য পর্যটন কেন্দ্রেও স্থবিরতা বিরাজ করছে। এদিকে পরিবেশ সুরক্ষার স্বার্থে গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে আগামী ৯ মাসের জন্য প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল ও ভ্রমণ সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করেছে সরকার।
স্থানীয়রা জানান, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও আসন্ন রমজান উপলক্ষে আজ শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি)ভ্যালেন্টাইন দিবসে কক্সবাজার একেবারেই পর্যটক শূন্য। স্থবিরতা বিরাজ করছে পর্যটন খাতে ৷ প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে কক্সবাজারে পর্যটকের ভিড় থাকলেও এবছর নির্বাচনী ব্যস্ততা ও রমজান সামনে থাকায় ভ্রমণ পরিকল্পনায় পর্যটকদের অনীহা দেখা গেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, রমজান মাসে সাধারণত পর্যটক উপস্থিতি কম থাকে, ফলে এ সময়টায় পর্যটন খাতে ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি হয়। তবে ঈদের পর সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশাবাদ রয়েছে।
জানা গেছে, নির্বাচন ও রমজান ঘিরে কক্সবাজারের প্রায় পাঁচ শতাধিক হোটেল-মোটেলের বুকিং ১৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। তারকা হোটেলগুলোতেও গড়ে ১০–১৫ শতাংশ কক্ষ বুকিং রয়েছে। এর বড় অংশ বিদেশি নাগরিক—বিশেষ করে এনজিও কর্মী ও উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা।
সাধারণ মানের হোটেল ও গেস্টহাউজগুলোর অনেকগুলোতেই বুকিং প্রায় শূন্যের কোটায়। গেল ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন উপলক্ষে অনেক প্রতিষ্ঠান তিন দিনের জন্য নতুন বুকিং নিরুৎসাহিত করেছিল। পর্যটক সংকটে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে সৈকতকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর। কলাতলী ও লাবণী পয়েন্টে কথা হয় কয়েকজন স্থানীয় হকার ও বাসিন্দার সঙ্গে।
সৈকতে ঝিনুক ও হস্তশিল্প বিক্রেতা শফিকুল ইসলাম বলেন, সাধারণত এ সময়ে সৈকতে দাঁড়ানোর জায়গা পাওয়া যায় না। কিন্তু এখন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত খুব কম মানুষ দেখা যাচ্ছে। পর্যটক না থাকলে আমাদের বিক্রি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
ভ্রাম্যমাণ ফটোগ্রাফার আবদুল মান্নান বলেন, নির্বাচনের সময় নিরাপত্তা জোরদার করা হলেও যানবাহন চলাচল কম থাকায় বাইরের মানুষ আসতে পারেননি। সামনে রমজান শুরু হলে পরিস্থিতি আরও স্থবির হবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
নারিকেল ও ফুচকা বিক্রেতা রহিমা বেগম বলেন, “আমরা দিন আনি দিন খাই মানুষ। নির্বাচনের কারণে পর্যটক আসতে পারেনি। সামনে রমজান, তখন তো একেবারেই পর্যটক আসবেনা।
শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) সমুদ্র সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে কথা হয় রাজশাহী থেকে আসা পর্যটক জাহিদুল হক চৌধুরী ও শামীম আহসানের সঙ্গে। তারা জানান, নির্বাচনের আগে কক্সবাজারে এসে কিছুটা আটকা পড়েছিলেন। আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবস, তাই এদিন স্মরণে রাখতে কক্সবাজারে অবস্থান করা। রমজান মাসে ধর্মীয় ব্যস্ততা থাকবে, এ সময়ে ভ্রমণের পরিকল্পনা নেই। তবে ঈদের পর আবারও সমুদ্র দেখতে আসার ইচ্ছা রয়েছে।
কক্সবাজার হোটেল-গেস্ট হাউজ মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার জানান, নির্বাচন উপলক্ষে গত মঙ্গলবার রাত থেকে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ট্যাক্সিক্যাব, কার, মাইক্রোবাস, পিকআপ ও ট্রাক চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। স্থানীয়ভাবে সিএনজি ও অটোরিকশা চলাচলও সীমিত ছিল। এতে পর্যটক আগমন আরও কমে যায়।
তিনি বলেন, নির্বাচনের অন্তত ১০ দিন আগে থেকেই কক্সবাজারে পর্যটক শূন্যতা অবস্থা বিরাজ করছে। এতে পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
মেরিন ড্রাইভ হোটেল মালিক সমিতি-এর সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, সামনে রমজান মাস এবং রিসেন্টলি জাতীয় সংসদ নির্বাচন গেল। আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবস হলেও তেমন পর্যটকের দেখা নেই। অথচ অন্যান্য বছর এ সময়টাতে পর্যটকে ভরপুর থাকে কক্সবাজার। মুকিম বলেন, ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তারকা ও মাঝারি মানের হোটেল গুলোয় কক্ষ বুকিং ১০ পারসেন্টের উপরে ছিলনা।
হোটেল ওশান প্যারাডাইস-এর পরিচালক আব্দুল কাদের মিশু জানান, নির্বাচনের অন্তত এক সপ্তাহ আগে থেকে রুম বুকিং প্রায় ছিলনা। ৩ থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গড়ে ১০–১৫ শতাংশ কক্ষ বুকিং ছিল, যার অর্ধেকই বিদেশি এনজিও কর্মী। আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি হোটেলে বুকিং আছে প্রায় ১০ শতাংশ।
হোটেল দি কক্স টুডে-এর মহাব্যবস্থাপক আবু তালেব বলেন, দুই শতাধিক কক্ষের মধ্যে মাত্র ২০–২৫টি বুকিং আছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, রমজানের ঈদের পর পর্যটন খাত আবারও স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিয়নের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. আপেল মাহমুদ জানান, আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি একটি বিশেষ দিন হওয়া সত্বেও ব্যবসায়ীদের আশানুরূপ পর্যটক নেই৷ নির্বাচন পরবর্তী সময়ে তারপরও কিছু কিছু পর্যটক ভ্রমণে এসেছেন।
আপেল জানান, কক্সবাজারে বেড়াতে এসে পর্যটকরা যাতে নিরাপদ ভ্রমণ শেষে নির্বিঘ্নে নিজ বাড়িতে ফিরে যেতে পারেন, সে জন্য সর্বদা কাজ করে যাচ্ছেন ট্যুরিস্ট পুলিশ।
ভোরের আকাশ/ র.ই