আট বছরেও আলোর মুখ দেখেনি ইছাপুরা-পাতিরা বালু সেতু, দুর্ভোগে এলাকাবাসী

রূপগঞ্জ উপজেলার ইছাপুরা-পাতিরা বালু সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার আট বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। দীর্ঘসূত্রতা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং বারবার ঠিকাদারি পরিবর্তনের কারণে গুরুত্বপূর্ণ এ অবকাঠামো প্রকল্পটি এখন এলাকাবাসীর জন্য চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বারবার আশ্বাস মিললেও দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় তাদের ভোগান্তির শেষ নেই
জানা গেছে, ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে প্রায় ৩৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা ব্যয়ে সেতু নির্মাণের প্রকল্প অনুমোদন পায়। প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। শুরুতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ পায় মেসার্স হক এন্টারপ্রাইজ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নানা জটিলতায় শুরু থেকেই প্রকল্পের গতি মন্থর হয়ে পড়ে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জমি-সংক্রান্ত জটিলতা, নকশা সংশোধন এবং কারিগরি সমস্যার কারণে প্রথম দিকে কাজের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়। পরবর্তীতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে অসন্তোষ দেখা দিলে প্রকল্পে স্থবিরতা তৈরি হয়। একপর্যায়ে কাজ বন্ধ হয়ে যায় দীর্ঘ সময়ের জন্য। এতে করে নির্মাণাধীন সেতুর অংশ বিশেষ অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকে।
২০২১ সালের পর নতুন করে অর্থ বরাদ্দ ও টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে পুনরায় কাজ শুরু হয়। তবে বাজেট সংশোধন, নকশা পরিবর্তন এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে কাজ আবারও ধীরগতিতে চলতে থাকে। বর্তমানে নির্মাণকাজ চলমান থাকলেও নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তা শেষ হবে কি না—এ নিয়ে সংশয় রয়েছে।
ইছাপুরা ও পাতিরা এলাকার বাসিন্দারা জানান, সেতুটি চালু না হওয়ায় প্রতিদিন তাদের বিকল্প ও দীর্ঘ পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী মানুষ ও ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন, “সেতু হলে আমাদের ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ যেতে সময় অর্ধেক কমে যেত। এখন ঘুরপথে যেতে হয়, খরচও বেশি লাগে।”
আরেক বাসিন্দা শিউলি বেগম জানান, বর্ষা মৌসুমে দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়। নদীপথ বা কাঁচা রাস্তা ব্যবহার করতে গিয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। অসুস্থ রোগী নিয়ে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়ে। স্থানীয় কৃষকরাও তাদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করতে বাড়তি পরিবহন ব্যয়ের মুখে পড়ছেন।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রকল্পের বিলম্ব অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও বিভিন্ন প্রশাসনিক ও কারিগরি জটিলতার কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এলজিইডির কর্মকর্তা আকতার হোসেন বলেন, “বাজেট সংশোধন, ঠিকাদারি পরিবর্তন ও নকশা সংশোধনের কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হচ্ছে। আমরা দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য তদারকি জোরদার করেছি।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, “নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমরা নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। এলাকাবাসীর দুর্ভোগ লাঘবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তিনি আরও জানান, সেতুটি সম্পন্ন হলে এটি পুরো এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, সেতুটি চালু হলে রূপগঞ্জ, দাউদপুর, রূপগঞ্জ সদর ও ভোলাব ইউনিয়নের সঙ্গে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ এবং পূর্বাচল আবাসিক এলাকার সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। এতে করে জনদূরত্ব কমে আসবে, যাতায়াতের সময় ও খরচ কমবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, সেতুটি চালু হলে পণ্য পরিবহন সহজ হবে এবং আশপাশের বাজারগুলোতে বেচাকেনা বাড়বে। একইসঙ্গে শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবীদের যাতায়াতও হবে আরও স্বাচ্ছন্দ্যময়। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এ প্রকল্প দ্রুত শেষ হলে এলাকার সামগ্রিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
তবে আট বছর পেরিয়ে গেলেও কাজ শেষ না হওয়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে হতাশা বাড়ছে। তাদের দাবি, দ্রুত কাজ শেষ করে সেতুটি যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হোক। দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে জনদুর্ভোগ লাঘবে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
ইছাপুরা-পাতিরা বালু সেতু এখন শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি স্থানীয় মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। সেই প্রত্যাশা পূরণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
ভোরের আকাশ/তা.কা