গাইবান্ধায় প্রথমবার বাণিজ্যিকভাবে খেজুরের চারা উৎপাদন

একসময় গ্রামবাংলার বাড়ির আঙিনা, জমির আইল কিংবা রাস্তার পাশে সারি সারি দেশি খেজুরগাছ ছিল পরিচিত দৃশ্য। কালের বিবর্তনে কমেছে সেই গাছের সংখ্যা। হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যের এই বৃক্ষ এবার নতুন সম্ভাবনা নিয়ে হাজির হয়েছে গাইবান্ধায়।
জেলার সদর উপজেলার বল্লমঝাড় ইউনিয়নের নারায়ণপুর এলাকায় প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে দেশি খেজুরের চারা উৎপাদন করছেন কৃষক মোস্তফা কামাল অ্যাপিল। মাত্র কয়েক শতাংশ জমিতে প্রায় ৭০০ চারা উৎপাদন করে তিনি দেখছেন বাড়তি আয়ের স্বপ্ন। তাঁর এই উদ্যোগ ঘিরে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে আগ্রহ।
শুরুটা ছিল একেবারেই শখের বশে। ছেলের আগ্রহ আর বজ্রপাতের ঝুঁকি কমানোর চিন্তা থেকে খেজুরগাছ লাগানোর উদ্যোগ নেন মোস্তফা কামাল। কয়েকটি বীজ দিয়ে তৈরি করেন বীজতলা। সেই ছোট্ট উদ্যোগই ধীরে ধীরে রূপ নেয় বাণিজ্যিক চারা উৎপাদনের সম্ভাবনায়। এখন তাঁর জমিতে সারি সারি খেজুরের চারা বেড়ে উঠছে। নিয়মিত পরিচর্যায় বড় হয়ে ওঠা এসব চারাই হয়ে উঠেছে তাঁর নতুন স্বপ্নের ভিত্তি।
মোস্তফা কামালের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি চারা প্রায় ৫০০ টাকা দরে বিক্রি করা সম্ভব। সে হিসাবে ৭০০টি চারা বিক্রি হলে মোট বিক্রয়মূল্য দাঁড়াতে পারে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। বীজ সংগ্রহ থেকে শুরু করে চারা বিক্রি পর্যন্ত সব মিলিয়ে খরচ হতে পারে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা। সব চারা প্রত্যাশিত দামে বিক্রি হলে খরচ বাদে উল্লেখযোগ্য অর্থ হাতে আসার আশা করছেন তিনি। তবে এটি সম্ভাব্য হিসাব; প্রকৃত আয় নির্ভর করবে উৎপাদন খরচ, চারার মান ও বাজারদরের ওপর।
শুধু আয় নয়, এই উদ্যোগের আরেকটি দিক হলো জমির কার্যকর ব্যবহার। অন্য ফসল চাষের জন্য কম উপযোগী কিংবা দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে থাকা জমিতেও খেজুরের চারা উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। ফলে অল্প জায়গায় তুলনামূলক কম বিনিয়োগে নতুন কৃষি উদ্যোগ গড়ে তোলার সম্ভাবনা দেখছেন স্থানীয় কৃষকেরা।
ইতোমধ্যে মোস্তফা কামালের উৎপাদিত চারার প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন আশপাশের মানুষ। কেউ চারা কিনতে আসছেন, কেউবা জানতে চাইছেন উৎপাদন পদ্ধতি ও পরিচর্যার কৌশল। এক কৃষকের ছোট্ট উদ্যোগকে ঘিরে অন্যদের মধ্যেও তৈরি হচ্ছে নতুন করে ভাবার সুযোগ। তবে বাণিজ্যিকভাবে সফল হতে চারার মান নিশ্চিত করা, সঠিক পরিচর্যা এবং বিক্রির বাজার তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষি বিভাগও খেজুরের চারা উৎপাদনকে কৃষি ও পরিবেশের জন্য সম্ভাবনাময় উদ্যোগ হিসেবে দেখছে। পরিকল্পিতভাবে খেজুরগাছ রোপণ করলে দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের উপকার হতে পারে। পাশাপাশি বজ্রপাতের ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগেও বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব রয়েছে। তবে বজ্রপাত থেকে সুরক্ষার জন্য শুধু গাছ লাগানোর ওপর নির্ভর না করে নিরাপদ আশ্রয় নেওয়া এবং সরকারি নির্দেশনা মেনে চলাও জরুরি।
এ বিষয়ে গাইবান্ধা সদর উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ইদ্রিস আলী বলেন,' চারা উৎপাদন, পরিচর্যা ও রোগবালাই ব্যবস্থাপনা বিষয়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সঠিক পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন এবং বাজারের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পিতভাবে এগোতে পারলে এ খাত থেকে বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।'
গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খেজুরগাছকে ঘিরে গাইবান্ধার নারায়ণপুরে মোস্তফা কামালের এই উদ্যোগ তাই কেবল চারা উৎপাদনের গল্প নয়; এটি অব্যবহৃত জমিকে কাজে লাগিয়ে নতুন সম্ভাবনা তৈরিরও গল্প। তাঁর উদ্যোগ সফল হলে অন্য কৃষকেরাও উৎসাহিত হতে পারেন বাণিজ্যিকভাবে খেজুরের চারা উৎপাদনে। এতে একদিকে হারিয়ে যেতে বসা দেশি খেজুরগাছের বিস্তার বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে কৃষকের আয়েও যোগ হতে পারে নতুন মাত্রা।
ভোরের আকাশ/ এনউব