শিরোনাম
বিদেশি সহায়তা নয়, বাংলাদেশ এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে নতুন বোর্ড গঠনের উদ্যোগবাংলাদেশে হামের প্রকোপ ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি ও পোলিও প্রাদুর্ভাবের ‘সতর্কতা’শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়লেও কমেছে শিক্ষার্থীবিদেশি ঋণ কমেছে ৪২.৩৪%, ছয় উন্নয়ন সহযোগীর প্রতিশ্রুতি নেইকক্সবাজারে আগুন: ডিএনএ পরীক্ষায় নিহত ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত, এখনো নিখোঁজ ১অনলাইন টিকিটের কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণ কঠিন: রেলমন্ত্রীনিপ্পন ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের নৈশভোজে যোগ দিলেন প্রধানমন্ত্রীবিদেশি সহায়তা নয়, বাংলাদেশ এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে নতুন বোর্ড গঠনের উদ্যোগবাংলাদেশে হামের প্রকোপ ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি ও পোলিও প্রাদুর্ভাবের ‘সতর্কতা’শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়লেও কমেছে শিক্ষার্থীবিদেশি ঋণ কমেছে ৪২.৩৪%, ছয় উন্নয়ন সহযোগীর প্রতিশ্রুতি নেইকক্সবাজারে আগুন: ডিএনএ পরীক্ষায় নিহত ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত, এখনো নিখোঁজ ১অনলাইন টিকিটের কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণ কঠিন: রেলমন্ত্রীনিপ্পন ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের নৈশভোজে যোগ দিলেন প্রধানমন্ত্রী

বিলুপ্তির পথে মৃৎশিল্প, টিকে থাকতে সংগ্রাম শিল্পীদের

গোলাম মওলা, শিবচর (মাদারীপুর) প্রতিনিধি

প্রকাশ : ৮ নভেম্বর ২০২৫, ৪:০১ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
ছবি: ভোরের আকাশ
ছবি: ভোরের আকাশ

বাংলার মৃৎশিল্প কেবল একটি পেশা নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও নান্দনিক রুচির এক জীবন্ত প্রতীক। একসময় গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল মাটির তৈরি হাঁড়ি, পাতিল, কলস, থালা, টোপা, ধূপদানী, প্রদীপ, খেলনা ও ফুলদানির মতো নানা সামগ্রী। মাটির সৌরভে ভরা সেই শিল্পচর্চা ছিল গ্রামবাংলার প্রতিটি উঠানের প্রাণ। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে আধুনিকতা ও প্লাস্টিকের দাপটে আজ সেই শিল্প ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে।

মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার ভদ্রাসন ইউনিয়নে এখনো টিকে আছে ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প। একসময় এ অঞ্চলের ঘরে ঘরে মাটির হাঁড়ি, পাতিল, ব্যাংক, ধুপতি ও দধির পাত্র তৈরির ধুম পড়ত। আজও বিমল পাল, কবিতা পাল, মড়াই পাল, কৃষ্ণ পাল, রন পাল, পন্নথ পাল, ভবনাথ পাল, বাবু পালসহ কয়েকজন শিল্পী পুরনো ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।

তারা এখনো তৈরি করেন কবুতরের খাবরা, হাড়ি-পাতিল, পাতিলের ঢাকনা, দধির পাত্র, টোপা, ধুপতি, পানির হাড়ি, মাটির ব্যাংক ইত্যাদি। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে এসব মাটির তৈজসপত্রের চাহিদা দিন দিন কমে যাচ্ছে। ফলে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন এসব শিল্পী।

একসময় তারা পাইকারি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এখন চাহিদা না থাকায় পাইকারও পাওয়া যায় না, তাই গ্রামে গ্রামে ঘুরে বিক্রি করতে হয়। প্রতিদিন প্রায় ৪০টি পণ্য তৈরি করলেও বিক্রির মাধ্যমে লাভের মুখ দেখা মুশকিল।

মৃৎশিল্পী কবিতা পাল জানান, “আমি প্রায় ৩০ বছর ধরে এই কাজ করছি। কিন্তু এই কাজের আয় দিয়ে সংসার চালানো খুবই কষ্টকর। মেয়েদের বিয়ে দিতে লোন নিতে হয়েছিল, এখনো কিস্তি চালিয়ে যাচ্ছি।”

আরেক শিল্পী কৃষ্ণ পাল বলেন, “এই পেশা আমাদের পূর্বপুরুষদের থেকে পেয়েছি। কিন্তু এখন চাহিদা কমে গেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে মৃৎশিল্পীরা সরকারি সহায়তা পেলেও আমরা কোনোদিন পাইনি। বারবার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে কিছুই হয় না।”

শিল্পী পন্নথ পাল জানান, তিনি বিভিন্ন ছাঁচে ফলের নকশা (তাল, আম, কাঁঠাল, আপেল, লিচু ইত্যাদি) দিয়ে মাটির ব্যাংক তৈরি করেন। সাইজভেদে ব্যাংকের দাম নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু কাঁচামালের দাম এখন আকাশচুম্বী। আগে যেসব উপকরণ ৫০০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন তা কিনতে লাগে প্রায় ২ হাজার টাকা।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব জামাল খালাসী বলেন, “ছোটবেলা থেকে আমরা দেখতাম সাহাপাড়া, পালপাড়া, শীলপাড়া, দাসপাড়ার প্রায় সবাই মাটির কাজ করত। কিন্তু গত ১০ বছরে এই শিল্প প্রায় বিলুপ্তির পথে। প্লাস্টিকের পণ্য সহজলভ্য হওয়ায় মাটির জিনিসের ব্যবহার কমে গেছে। অথচ প্লাস্টিক আমাদের পরিবেশ এবং শরীরের  জন্য ক্ষতিকর। সরকারের উচিত প্লাস্টিকের ব্যবহার সীমিত করে মাটির পণ্যের প্রচলন বাড়ানো।”

সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আহসান হাবিব বলেন, “মাটির তৈজসপত্র কেবল ঐতিহ্যের অংশ নয়, বরং এটি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই জীবনের প্রতীক। এসব পাত্রে কোনো ধরনের রাসায়নিক বা ক্ষতিকর উপাদান থাকে না, ফলে এতে রান্না বা খাদ্য সংরক্ষণ সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং খাবারের পুষ্টিগুণও অক্ষুণ্ণ থাকে। তাই মৃৎশিল্পের বিকাশ ও সংরক্ষণ এখন সময়ের দাবি।”

বিসিক, মাদারীপুরের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. জালিস মাহমুদ বলেন, “আমি মাদারীপুরে সদ্য যোগদান করেছি, তাই এখনো এই বিষয়ে বিস্তারিত জানার সুযোগ হয়নি। খুব শিগগিরই আমি সংশ্লিষ্ট এলাকা পরিদর্শন করব এবং পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করব।”

শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এইচ. এম. ইবনে মিজান বলেন, “মৃৎশিল্প আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা বাংলার ঐতিহ্য বহন করে। এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা আমাদের দায়িত্ব। ভদ্রাসনের পাল পাড়ায় বিলুপ্তপ্রায় এই মৃৎশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে কারিগরদের প্রশিক্ষণ ও আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় উন্নয়নমূলক কার্যক্রম হাতে নেওয়া হবে।”

আজও ভদ্রাসনের কুমারদের হাতে যে মাটি ঘুরে ঘুরে হাঁড়িতে রূপ নেয়, সেখানে লুকিয়ে আছে গ্রামের পুরোনো দিনের স্মৃতি আর মানুষের মায়া। মাটির হাঁড়ি শুধু রান্নার পাত্র নয়, এ যেন সময়ের সাক্ষী, প্রজন্মের পর প্রজন্ম  ধরে বয়ে চলা ঐতিহ্যের নিঃশব্দ ভাষা।

একটা সময় যেই মৃৎশিল্প ছিল গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তা এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। সরকারি সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও বিপণন সুবিধা বাড়ানো না গেলে এই ঐতিহ্য একদিন পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যাবে—এমন আশঙ্কাই করছেন স্থানীয়রা।

ভোরের আকাশ/জাআ

মাদারীপুরের শিবচরবিলুপ্তির পথেমাদারীপুরমৃৎশিল্প

শেয়ার করুন: