হারিয়ে যাচ্ছে সিরাজদিখানের ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প পেশা

মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার শেখরনগর ইউনিয়নের পাউসার গ্রাম, এক সময় এই গ্রাম ছিল তাঁত শিল্পের জন্য পরিচিত। কাঁচামালের আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাব এবং প্রয়োজনীয় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ঐতিহ্যবাহী এই তাঁত শিল্প এখন চরম সংকটে। ফলে বাপ-দাদার পেশা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন অসংখ্য কারিগর।
পাউসার গ্রামের প্রায় তিন শতাধিক পরিবার সরাসরি জড়িত ছিল তাঁত বুননের সঙ্গে। তাঁতের খটখট শব্দে মুখর থাকত পুরো গ্রাম। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। ঐতিহ্যবাহী এই পেশা এখন বিলুপ্তির পথে।
স্থানীয়দের তথ্যমতে, বর্তমানে পাউসার গ্রামে মাত্র ৫০টি পরিবার কোনোভাবে তাঁত শিল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।
তাঁতিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া, শ্রমের তুলনায় কম আয় এবং বাজারে প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে তাঁত শিল্প এখন আর আগের মতো লাভজনক নয়। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে বাপ-দাদার এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন। কেউ পাড়ি জমিয়েছেন বিদেশে, কেউ আবার সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে যুক্ত হয়েছেন। আবার অনেকে জীবিকার তাগিদে অন্য ব্যবসা বা পেশা বেছে নিয়েছেন।
একসময় যে তাঁত ছিল পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস, এখন অনেকের কাছেই তা হয়ে উঠেছে অনিশ্চিত জীবিকার প্রতীক।
তাঁত ব্যবসায়ী ইলিয়াস আলী জানান, 'সুতা, রংসহ তাঁত শিল্পের বিভিন্ন কাঁচামালের দাম বাড়লেও তৈরি পণ্যের ন্যায্য দাম বাড়েনি। ফলে দিন-রাত পরিশ্রম করেও আগের মতো লাভ হচ্ছে না। নতুন প্রজন্মও এই পেশায় আগ্রহ হারাচ্ছে '।
তাঁত মালিক কামরুল হক লিপু হতাশা প্রকাশ করে বলেন, 'একসময় তাঁতিদের হাতে তৈরি বস্ত্রশিল্পের জন্য সুপরিচিত ছিল আমাদের পাউসার গ্রাম। গ্রামটিতে ৩ শতাধিক তাতী ছিল। ঐতিহ্যবাহী এই তাঁত শিল্প এখন চরম সংকটে। সুতার দাম অনেক বেশি, সে তুলনায় লুঙ্গির দাম কম। লোকসানের কারণে আমাদের এলাকায় কয়েকশ তাঁত প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। এখন ৪০ থেকে ৫০টি তাঁত তার প্রতিষ্ঠান কোনরকম আছে, ফলে বাপ-দাদার পেশা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন অসংখ্য কারিগর। তাই ঐতিহ্যের এই শিল্পকে বাঁচাতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে, হয়তো একদিন পাউসার গ্রামের তাঁতের খটখট শব্দও শুধুই স্মৃতি হয়ে থাকবে।
শেখরনগর ইউপি চেয়ারম্যান দেবব্রত সরকার টুটুল বলেন, 'তাঁত শিল্প শুধু একটি পেশা নয়, এটি পাউসার গ্রামের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ। এক সময় গ্রামের প্রতিটি পাড়া থেকেই তাঁতের শব্দ শোনা গেলেও এখন সেই শব্দ অনেকটাই থেমে গেছে। আবার যুব সমাজের একটা অংশ এই পেশাকে পছন্দ না করার কারনেও তাত শিল্পীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে।
সিরাজদিখান উপজেলা নির্বাহী অফিসার রুম্পা ঘোষ বলেন, 'তাঁত শিল্প বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্য। এ ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা আমাদের দায়িত্ব। সরকারিভাবে কেউ সহযোগিতা নিতে চাইলে আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করব। এলাকায় এসব পণ্য বাজারজাত করার জন্য চেষ্টা করা হবে।,
ভোরের আকাশ/ইউএম