মেহেরপুরে আবুল কাশেম বয়াতির স্মরণে জারিগানের আসর

গ্রামীণ জনপদে বিনোদন, আধ্যাত্মিক চেতনা ও ইতিহাসচর্চার অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম জারিগান। বাংলার লোকসংগীতের এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে মেহেরপুর সদর উপজেলার আশরাফপুর গ্রামে মরহুম আবুল কাশেম বয়াতির স্মরণে বিশেষ জারিগানের আসর অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সকালে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বয়াতিরা তাঁদের সুরেলা কণ্ঠে কারবালার শোকগাথা ও ঐতিহ্যবাহী ধুয়া জারি পরিবেশন করেন।
অনুষ্ঠানে কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে জারিগান পরিবেশন করেন বয়াতি সেলিম রেজা। তিনি বলেন, “কারবালার মর্মান্তিক যুদ্ধ এবং ইমাম হাসান-হোসেনের শাহাদাতের বিয়োগান্তক কাহিনিকে কেন্দ্র করে জারিগানের উৎপত্তি। তবে বর্তমানে কারবালার কাহিনির পাশাপাশি বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনা, ধর্মীয় উপাখ্যান ও সামাজিক সচেতনতামূলক বিষয়ও এ গানের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। আমার গুরু আবুল কাশেমের কাছে দীর্ঘদিন ধরে এই গান শিখেছি।”
অন্যদিকে, কুষ্টিয়ার দৌলতপুর থেকে আসা বয়াতি আনারুল হাজিরা বনবাসের কাহিনি নিয়ে গান পরিবেশন করেন। তিনি বলেন, “সাধারণত দেহতত্ত্ব, আধ্যাত্মিকতা, প্রেম-বিচ্ছেদ, সামাজিক চিত্র এবং প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে জারিগান পরিবেশন করা হয়। আমি প্রায় ২০ বছর ধরে ধুয়া জারি গান গাইছি। বাংলাদেশের টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন অঞ্চলেও এ গান বেশ জনপ্রিয়।”
অনুষ্ঠানের আয়োজক সাগর বয়াতি জানান, গ্রামীণ ঐতিহ্য ধরে রাখার উদ্দেশ্যে তাঁর বাবা আবুল কাশেম বয়াতির মৃত্যুর পর থেকেই তিনি নিয়মিত এলাকার পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে বয়াতিদের এনে এ ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আসছেন।
জারিগানের পরিবেশনা সম্পর্কে তিনি বলেন, সাধারণত দলগতভাবে এ গান গাওয়া হয়। এতে একজন প্রধান বয়াতি থাকেন। তাঁর সঙ্গে একদল ‘জারিয়াল’ বা খেলোয়াড় অংশ নেন। তাঁরা গানের তালে তালে নেচে দোহার ধরেন। অনেক সময় দুই দলের মধ্যে ‘পাল্লা’ বা গানের প্রতিযোগিতাও অনুষ্ঠিত হয়।
এদিনের আসরে আশরাফপুর গ্রামের সেলিম বয়াতির সঙ্গে দোহার ও বাদ্যযন্ত্রে অংশ নেন আনিস বয়াতি, ইজারুল বয়াতি, বুদু, জামাল ফকির, চান্দু, কাবুর ও সামাদ ঢোলী। অন্যদিকে, কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের আনারুল বয়াতির সঙ্গে ছিলেন হাসেম উদ্দিন, লাড়ু, রফিকুল ঢুলী ও জিলাহক।
বয়াতিরা জানান, জারিগানের মতো ঐতিহ্যবাহী লোকসংগীত টিকিয়ে রাখতে সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন। তাঁদের মতে, প্রতিটি জেলার জারিগানশিল্পীদের জেলা শহরের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে নতুন প্রজন্ম এ লোকসংগীত সম্পর্কে জানতে ও এর ঐতিহ্যকে ধারণ করতে পারবে।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ফারসি শব্দ ‘জারি’র অর্থ শোক, আর্তনাদ বা বিলাপ। বাংলায় শিয়া সংস্কৃতির প্রভাবে মূলত সপ্তদশ শতক থেকে জারিগানের প্রচলন শুরু হয়। ১৬৪৫ সালে মুহম্মদ খানের লেখা ‘মাকতুল হুসেন’ (হুসেনের শাহাদাত) কাব্যকে কেন্দ্র করে বাংলায় মার্সিয়া সাহিত্য ও জারিগানের বিকাশ ঘটে বলে উল্লেখ করা হয়। বিশেষ করে মহররম মাসে কারবালার ঐতিহাসিক ও বিয়োগান্তক ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জসহ বিভিন্ন অঞ্চলে এ গানের প্রচলন বিস্তার লাভ করে।
পরবর্তী সময়ে পল্লীকবি জসীমউদ্দীন ১৯৬৮ সালে তাঁর ‘জারীগান’ গ্রন্থে দেশজুড়ে প্রচলিত এ লোকসংগীতের সংকলন প্রকাশ করেন। দীর্ঘদিনের এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে আশরাফপুরে আয়োজিত এমন আসর স্থানীয় মানুষের কাছে লোকসংস্কৃতি চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ভোরের আকাশ/জেআ