ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নোঙর বাংলাদেশের নতুন কমিটি ঘোষণা

‘নদী বাঁচাও, দেশ বাঁচাও, প্রকৃতি বাঁচাও’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে অরাজনৈতিক ও অলাভজনক সংগঠন নোঙর বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শাখার নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সমন্বয়ে গঠিত নতুন কমিটির মধ্য দিয়ে সংগঠনটির জেলা শাখার নবযাত্রা শুরু হয়েছে। এ উপলক্ষে সোমবার (১০ আগস্ট) দিবাগত রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদরের জামে মসজিদ রোডের গ্র্যান্ড এ মালেক চাইনিজ রেস্টুরেন্টে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
শিক্ষক মো. মোশারফ হোসেন ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে সভায় সাংবাদিক মো. নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া বিল্লালের সঞ্চালনায় বক্তব্য ও মতামত দেন শিক্ষক মো. মনির হোসেন, স্বাস্থ্যকর্মী মো. মনিরুল ইসলাম, শিক্ষক মো. আজিজুর রহমান, সাংবাদিক মোজাম্মেল চৌধুরী, ব্যবসায়ী মো. কামাল উদ্দিন, সাংবাদিক মফিজুর রহমান লিমন, শাহাদাৎ হোসেন, মো. আবুল হাসনাত অপু, আশরাফুল ইসলাম সুমন, আবু নাছের রতন, আশেক মান্নান হিমেল, মাজহারুল আহমদ চৌধুরী মঞ্জু, আবু সোহেল সরকার, আবদুল্লাহ আল নাঈম, খাইরুল কবির, প্রকৌশলী খলিলুর রহমান, অ্যাডভোকেট আনিছুর রহমান, ব্যবসায়ী শাহীন আহমেদ, নিশাদুল ইসলাম, সমাজকর্মী কোহিনুর আক্তার, শাহ মাহমুদা আক্তার সখি, শামীমা বাছির স্মৃতি, উম্মে সালমা হ্যাপি, জেসমিন আক্তার, ফেরদৌসি আক্তার, ব্যবসায়ী মো. আলম রানা, শামছুর রহমান সজীব, মো. সবুজ মিয়াসহ অনেকে।
আলোচনায় বক্তারা নোঙরের বিগত কমিটির কার্যক্রমের সমালোচনা করেন। তাঁরা অভিযোগ করেন, আগের কমিটি সংগঠনের গঠনতন্ত্র, নীতি ও আদর্শ অনুসরণ না করে একটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী কার্যক্রমে সরাসরি অংশ নিয়েছিল। নতুন কমিটি অরাজনৈতিক নীতিতে সব ধরনের চাপ উপেক্ষা করে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে বলে তাঁরা প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
বক্তারা পলিতে ভরাট হয়ে যাওয়া তিতাস ও মেঘনা নদী যথাযথভাবে খননের দাবি জানান। একই সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত টাউন খাল সম্পূর্ণ খনন এবং খালের ওপর নির্মিত ফোর লেনের পিলার অপসারণ করে এর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার দাবি করেন।
এ ছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদরসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যক্তি মালিকানার নামে ভরাট করে ফেলা পুকুর উদ্ধার এবং আবর্জনায় ভরে থাকা পুকুর ও জলাশয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার জন্য সরকার, জেলা প্রশাসন ও পৌর প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। নদী ও জলাশয়ে পলিথিনসহ আবর্জনা ফেলে পানি দূষণ ও জলাশয় ভরাট না করতে জনগণের প্রতিও আহ্বান জানান বক্তারা।
সভায় শিক্ষক মো. মনির হোসেনকে সভাপতি, সাংবাদিক মো. নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া বিল্লালকে সাধারণ সম্পাদক, মোজাম্মেল চৌধুরীকে সহসাধারণ সম্পাদক, ব্যবসায়ী মো. কামাল উদ্দিনকে সাংগঠনিক সম্পাদক, সাংবাদিক আশেক মান্নান হিমেলকে কোষাধ্যক্ষ এবং সাংবাদিক মো. আবুল হাসনাত অপুকে দপ্তর সম্পাদক করে ৫৫ সদস্যের কার্যকরী কমিটি ঘোষণা করা হয়। পাশাপাশি ১৫ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদসহ মোট ৭০ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।
নোঙর বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা সুমন শামস মুঠোফোনে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, ‘নদী বাংলাদেশের প্রাণ। আর সেই প্রাণের স্পন্দন ব্রাহ্মণবাড়িয়া। তিতাস, মেঘনা ও খাল-বিলের জালে বোনা এই জেলার প্রতিটি ইট ও প্রতিটি ফসলের সঙ্গে নদীর সম্পর্ক রয়েছে। এই সময়ে নোঙর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শাখার নবযাত্রা শুধু একটি কমিটি গঠন নয়, এটি একটি প্রতিজ্ঞা।’
তিনি আরও বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সব নদ-নদী, খাল-বিল ও প্রাণ-প্রকৃতি সুরক্ষায় নবগঠিত জেলা কমিটি একটি উদাহরণ সৃষ্টি করবে বলে তিনি আশাবাদী। একসময়ের খরস্রোতা তিতাস নদী বর্তমানে অনেক জায়গায় নালায় পরিণত হয়েছে। নদীর তীর দখল করে মার্কেট নির্মাণ, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন এবং শিল্পবর্জ্যে খাল-বিল ভরাটের কারণে জলাবদ্ধতা নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে।
সুমন শামস বলেন, ‘তিতাস নদী মরলে মাছ মরে, কৃষি মরে, মানুষের জীবিকা মরে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হাওর-বাঁওড়ের জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়বে। এই বাস্তবতায় “নোঙর” নামটিই একটি বার্তা। নোঙর মানে স্থিরতা, মনে আঁকড়ে ধরা। নদী ও প্রকৃতিকে আঁকড়ে ধরার জন্যই এই নোঙর।’
তিনি বলেন, শুধু প্রতিবাদ নয়, নদী দখলকারীদের তালিকা তৈরি করে প্রশাসনের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। স্কুল-কলেজ ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ‘নদী বাঁচাও’ কর্মসূচি চালু করতে হবে। নদীকে আবর্জনার ভাগাড় হিসেবে না দেখার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে নদী পুনরুদ্ধারের মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে কাজ করতে হবে।
নোঙর বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা আরও বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া মানেই প্রতিবাদী মানুষ। সেই প্রতিবাদী শক্তিকে নোঙর সঠিক পথে কাজে লাগাতে পারলে এই জেলা কমিটি সত্যিই উদাহরণ সৃষ্টি করবে।’
তিনি নোঙর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে নবগঠিত কমিটিকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। একই সঙ্গে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘নোঙর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কমিটির হাত ধরেই তিতাস আবার তার যৌবন ফিরে পাক। নদী বাঁচালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাঁচবে, বাংলাদেশ বাঁচবে। নোঙর ফেলুন, নদীকে বাঁচান।’
ভোরের আকাশ/সু.পা