ডাকাতিয়ায় এখন দূষণের রাজত্ব,বিলুপ্তির পথে দেশীয় মাছ

একসময় যে নদী ছিল দেশীয় মাছের ভান্ডার, সেই ডাকাতিয়া এখন নিজেই অস্তিত্ব সংকটে। স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটার প্রবাহ না থাকায় লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে ডাকাতিয়া নদী ও সংযুক্ত খালগুলোতে দেখা দিয়েছে পানিদূষণ।
কোথাও পানি কালচে, কোথাও ছড়াচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধ। কমছে দেশীয় মাছের সংখ্যা, পেশা বদলাতে বাধ্য হচ্ছেন জেলেরা। নদীর পানি ব্যবহার করতে না পেরে ভোগান্তিতে পড়েছেন নদীপাড়ের বাসিন্দারাও। সংশ্লিষ্ট মৎস্য বিভাগের হিসাবে, চাঁদপুর সেচ প্রকল্প এলাকায় প্রায় ৮০ শতাংশ মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় ডাকাতিয়া নদী ও এর সংযুক্ত খালগুলোতে রুই, কাতলা, মৃগেল, আইড়, কালিবাউশ ও বোয়ালসহ প্রায় ১০০ প্রজাতির ছোট-বড় মাছ পাওয়া যেত। নদী ও খালে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন বহু পরিবার।
জাল, বড়শি, টেঁটা ও আনতা ছিল তাঁদের জীবিকার প্রধান অবলম্বন। কিন্তু পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়া ও দূষণের কারণে এখন সেই চিত্র পাল্টে গেছে। নদীতে মাছের দেখা মেলা যেমন কঠিন হয়েছে, তেমনি কমেছে স্থানীয় বাজারে দেশীয় মাছের সরবরাহ।
উপজেলার দেবীপুর গ্রামের বাসিন্দা জসিমউদ্দীন বলেন, একসময় নদীর পানি ছিল স্বচ্ছ, মাছও পাওয়া যেত প্রচুর। এখন পানি কালচে হয়ে গেছে, সঙ্গে রয়েছে দুর্গন্ধ। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে দুর্গন্ধ এতটাই বেড়ে যায় যে ঘরে থাকাও কষ্টকর।
নদীর পাশে থেকেও এখন সেই পানি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে এমন অবস্থা চললেও স্থায়ী সমাধান হয়নি।
নদীতে মাছ ধরে সংসার চালাতেন আব্দুল হক। তিনি বলেন, আগে কয়েক ঘণ্টা মাছ ধরলেই পরিবারের খরচ চালানোর মতো মাছ পাওয়া যেত। এখন দীর্ঘ সময় জাল ফেলেও তেমন মাছ মেলে না। বাধ্য হয়ে অনেক জেলে পেশা পরিবর্তন করেছেন।
নদীতে আগের মতো পানি চলাচল না থাকলে তাঁদের মতো জেলেদের জীবিকা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
নদীর দূষিত পানিতে বিপাকে পড়েছেন গৃহস্থালির কাজ করা মানুষও। স্থানীয় গৃহবধূ লিপিকা হাওলাদার বলেন, আগে নদীর পানি দিয়ে গোসল, থালাবাসন ধোয়াসহ সংসারের নানা কাজ করা হতো। এখন পানিতে দুর্গন্ধ, কখনো রংও পরিবর্তন হয়ে যায়।
এ পানি ব্যবহার করতে ভয় লাগে। পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্য নিয়েও দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি নিষ্কাশন ও কৃষিকাজে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১৯৭৫ সালে চাঁদপুর সেচ প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হয়।
রায়পুর, রামগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর সদর (আংশিক), ফরিদগঞ্জ, হাইমচর ও চাঁদপুর সদর (আংশিক) উপজেলা নিয়ে গঠিত এ প্রকল্পের পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হয় রায়পুরের হাজীমারা স্লুইস গেট ও চাঁদপুরের চরবাগাদী নেভিগেশন গেটের মাধ্যমে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, প্রকল্প এলাকায় ৫৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ডাকাতিয়া নদী এবং প্রায় ৭৫৬ কিলোমিটার খাল রয়েছে। প্রতি বছর নভেম্বরের শেষ দিকে চরবাগাদী পাম্প হাউসের নিচের অংশে যান্ত্রিক মেরামতের সুবিধার্থে প্রকল্প এলাকার অধিকাংশ পানি বের করে দেওয়া হয়।
এতে অনেক খাল পানিশূন্য হয়ে পড়ে। অন্যদিকে দীর্ঘ সময় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকায় নদী ও খালের বিভিন্ন স্থানে পানি স্থির হয়ে দূষণ ছড়াচ্ছে।
এর প্রভাব পড়ছে মৎস্যসম্পদ, কৃষি ও পরিবেশের ওপর। মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তার ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি নদীনির্ভর মানুষের আয় কমছে।
খালে পানির স্বল্পতায় সেচ সুবিধা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে নদীপাড়ের জনবসতিতে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় শিশু, বৃদ্ধসহ সব বয়সী মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
লক্ষ্মীপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন বলেন, স্লুইস গেট বন্ধ থাকায় দীর্ঘ সময় পানি স্থির হয়ে দূষিত হচ্ছে।
এতে নদী ও খালের পরিবেশ দুর্গন্ধময় হয়ে উঠছে। পানি সংকট ও দূষণের কারণে চাঁদপুর সেচ প্রকল্প এলাকায় প্রায় ৮০ শতাংশ মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এর প্রভাব পড়ছে রায়পুর মৎস্য প্রজনন কেন্দ্রে রেণু ও পোনা উৎপাদনসহ নদী, খাল ও পুকুরের মাছের উৎপাদনে।
তিনি বলেন, মৎস্যসম্পদ ও পরিবেশ রক্ষায় স্লুইস গেট দিয়ে পরিকল্পিতভাবে জোয়ার-ভাটার পানিপ্রবাহ চালু রাখা প্রয়োজন। এতে মাছের প্রজনন ও উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি পানিদূষণও কমানো সম্ভব হবে।
রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আজিজুন্নাহার বলেন, নদী ও খালের পানিদূষণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড, মৎস্য বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে সমস্যার কারণ অনুসন্ধান এবং প্রতিকারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু সাময়িক উদ্যোগ নয়, ডাকাতিয়া নদীকে বাঁচাতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। হাজীমারা ও চরবাগাদী গেটের পানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পুনর্মূল্যায়ন, পরিকল্পিত জোয়ার-ভাটার প্রবাহ নিশ্চিত করা, পানির মান পরীক্ষা এবং দূষণের উৎস শনাক্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
একই সঙ্গে দেশীয় মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তার রক্ষায় উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। যে ডাকাতিয়া একসময় হাজারো মানুষের জীবিকা জুগিয়েছে, সেই নদী আজ তাদের দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভোরের আকাশ/ এনউব