জমিজমা ও টাকার লোভ
নিয়ামতপুরে চার খুনের নেপথ্যে আপন ভাগ্নে ও দুলাভাই

সম্পত্তির নেশা আর অর্থের লালসা কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার এক নৃশংস দৃষ্টান্ত হয়ে রইল নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রাম। মাত্র কয়েক বিঘা জমি আর পকেটের দেড় লাখ টাকার লোভে আপন মামা, মামী এবং দুই শিশু সন্তানকে গলাকেটে হত্যা করেছে আপন দুই ভাগ্নে ও এক দুলাভাই। পুলিশের দ্রুত অভিযানে বেরিয়ে এসেছে এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের আদ্যোপান্ত।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাহাদুরপুর গ্রামের নমির উদ্দিনের এক ছেলে ও পাঁচ মেয়ে। দীর্ঘদিনের নিয়ম ভেঙে নমির উদ্দিন তার ১৭ বিঘা সম্পত্তির মধ্যে বসতবাড়িসহ ১৩ বিঘাই লিখে দেন একমাত্র ছেলে হাবিবুর রহমানকে (৩৫)। বাকি ৪ বিঘা ভাগ করে দেন পাঁচ মেয়ের মধ্যে।
এই অসম বণ্টনই কাল হয়ে দাঁড়ায় হাবিবুরের জন্য। বোন, ভগ্নিপতি ও ভাগ্নেদের মনে পুঞ্জীভূত হতে থাকে ক্ষোভ। তাদের পরিকল্পনা ছিল—যদি হাবিবুরের পুরো পরিবারকে ‘নির্বংশ’ করা যায়, তবে ওই ১৩ বিঘা সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে বোনেরাই।
গত সোমবার ছিল হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত দিন। এদিন বিকেলে ভাগ্নে সবুজ রানাকে সঙ্গে নিয়েই ছাতড়া বাজারে গরু কিনতে গিয়েছিলেন হাবিবুর। তার পকেটে ছিল ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা। গরু না কিনেই বাড়িতে ফিরে আসেন তারা। ওই দিনই সন্ধ্যায় গ্রামের এক মাঠে বসে সবুজ রানা, শহিদুল ও শাহিনসহ ছয়জন মিলে খুনের চূড়ান্ত নীল নকশা তৈরি করে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, সোমবার রাত ৮টার দিকে হাবিবুরের বাড়িতে যায় ভাগ্নে সবুজ। সেখানে মামা-মামীর সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে রাতের খাবারও খায় সে। এরমধ্যেই অন্য এক ভাগ্নে চুপিচুপি ঘরে ঢুকে লুকিয়ে থাকে। সবাই ঘুমিয়ে পড়লে রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে শুরু হয় অপারেশন।
শাহিন ভেতর থেকে দরজা খুলে দিলে ঘরে ঢোকে আরও পাঁচজন। প্রথমে বাবা নমির উদ্দিনের ঘরে বাইরে থেকে শিকল তুলে দেওয়া হয়। এরপর ঘুমন্ত অবস্থায় হাবিবুরকে ছুরি দিয়ে গলাকেটে হত্যা করা হয়।
তৎক্ষণাৎ বাথরুমে যাওয়ার জন্য ঘর থেকে বের হওয়া মামী পপি সুলতানাকে হাসুয়া দিয়ে আঘাত করে মাটিতে ফেলে দেয় তারা। পরে তাকেও জবাই করা হয়। সবশেষে ‘নির্বংশ’ করার মিশন সফল করতে ৯ বছর বয়সী পারভেজ ও মাত্র ৩ বছরের শিশু সাদিয়াকেও রেহাই দেয়নি ঘাতকরা।
মঙ্গলবার সকালে যখন পুরো এলাকায় শোকের ছায়া, তখন ঘাতক সবুজ, শহিদুল ও শাহিন নির্লিপ্তভাবে হাবিবুরের বাড়িতে এসে কান্নার অভিনয় শুরু করে। কিন্তু পুলিশের সন্দেহ এড়াতে পারেনি তারা। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে ভেঙে পড়ে সবুজ রানা। তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী খড়ের পাল থেকে হাসুয় এবং পুকুর থেকে রক্তমাখা ছুরি উদ্ধার করে ডিবি পুলিশ।
বুধবার দুপুরে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, মূলত জমি আত্মসাৎ এবং সাথে থাকা টাকা লুটের উদ্দেশ্যেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।এই ঘটনা কেবল একটি জনপদকে স্তব্ধ করেনি, বরং পারিবারিক সম্পর্কের চরম অবক্ষয়ের এক করুণ চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। সম্পত্তির লোভে যেখানে আপন রক্তই হয়ে উঠেছে ঘাতক।
ভোরের আকাশ/ র.ই