নারী উন্নয়ন প্রকল্পের নামে নতুন ফাঁদ ৫০০ টাকায় গরু ও ৩৫০ টাকায় ল্যাপটপ

নারীদের ক্ষমতায়ন, আইনি সহায়তা ও অর্থনৈতিকভাবে নারীদের স্বাবলম্বী করার নামে কুড়িগ্রামে নতুন ধরনের প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে।
‘নারী উন্নয়ন প্রকল্প’ নামে একটি কথিত সংগঠনের নামে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সারাদেশের অফিসের কার্যক্রম, চাকরি দেয়ার নামে ভুয়া ছবি পোস্ট , গরু, ছাগল, ঘর, টিউবওয়েল, সেলাই মেশিন, ল্যাপটপ ও আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন উপজেলার নারী ও শিক্ষার্থীদের টার্গেট করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, “নারী উন্নয়ন প্রকল্প, আনন্দ বাজার রোড, রাজারহাট, কুড়িগ্রাম” নামে প্রচার করা হলেও স্থানীয়ভাবে এমন কোনো নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। মূলত ‘নারী উন্নয়ন প্রকল্প’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকেই পরিচালিত হচ্ছে তাদের সকল কার্যক্রম।
পেজটিতে দেশের বিভিন্ন এলাকার নারীদের চাকরি প্রদান, ঘর নির্মাণ, গরু-ছাগল বিতরণ, টিউবওয়েল স্থাপন ও আর্থিক অনুদান প্রদানের নানা ছবি ও পোস্ট প্রকাশ করে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করা হচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রথমে চাকরির বিজ্ঞাপন দিয়ে নারীদের আবেদন করতে উৎসাহিত করা হয়। এরপর বিভিন্ন ধাপে যোগাযোগ করে মাঠকর্মী, সুপারভাইজারসহ নানা পদে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। শুরুতে কোনো ধরনের ঘুষ বা আর্থিক লেনদেন লাগবে না বলা হলেও পরে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন ও চাকরি নিশ্চিত করার কথা বলে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়।
শুধু চাকরিই নয়, সংগঠনটির সদস্য হওয়ার পর বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সহায়তা পাওয়ার প্রলোভনও দেখানো হয়।
নিয়োগ চূড়ান্ত হওয়ার পর সদস্যদের কাছ থেকে ঘর নির্মাণের জন্য দুই কক্ষের আবেদনে ৫৫০ টাকা, টিউবওয়েলের জন্য ৩০০ টাকা, দুটি বাথরুমের জন্য ৪০০ টাকা, সেলাই মেশিনের জন্য ২৫০ টাকা, ল্যাপটপের জন্য ৩৫০ টাকা, গরুর জন্য ৫০০ টাকা এবং ছাগলের জন্য ৪০০ টাকা আবেদন ফি নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
আবেদনকারীদের এসব তথ্য অন্য কাউকে না জানানোর জন্যও চাপ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, অর্থ আদায়ের জন্য ‘আফরিন’ নাম ব্যবহার করে একটি বিকাশ নম্বর 01832982745
এবং যোগাযোগের জন্য লোকমান হোসেন 01735331774 পরিচয়ে একটি মোবাইল নম্বর ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে এসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কোনো বৈধ পরিচয় পাওয়া যায়নি।সরাসরি কারো সাক্ষাৎ হয় নাই।ইমুতে কথা বলে বিকাশে টাকা নিয়ে নম্বর ব্লক করে দিচ্ছে এই প্রতারক চক্রটি।
রাজারহাট উপজেলার চাকরিপ্রত্যাশী মোছা. সুমাইয়া পায়েল জানান, ফেসবুকে নারী উন্নয়ন প্রকল্পের বিভিন্ন কার্যক্রম দেখে তিনি আকৃষ্ট হন। পরে সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে প্রথমে কোনো ধরনের টাকা লাগবে না বলা হলেও আবেদন জমা দেওয়ার পর নিয়োগ চূড়ান্তের অজুহাতে অর্থ দাবি করা হয়।
তিনি বলেন, পেজে দেশের বিভিন্ন স্থানে নারীদের চাকরি, গরু-ছাগল ও আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ছবি দেখে বিশ্বাস করেছিলাম। পরে তারা চাকরি নিশ্চিত করার কথা বলে টাকা চায়। এছাড়া চাকরি পেলে সদস্যদের কাছ থেকে অনুদানের টাকা সংগ্রহ করার দায়িত্বও দেওয়া হবে বলে জানানো হয়।
এ বিষয়ে কথিত সংগঠনটির দেওয়া মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে অভিযোগের বিষয়ে তাদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে চাকরি ও অনুদানের নামে প্রতারণার ঘটনা বেড়েছে। বিশেষ করে বেকার তরুণী, কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী ও নিম্ন আয়ের নারীদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে এ ধরনের চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। আকর্ষণীয় বেতন, সহজ শর্তে চাকরি এবং অল্প টাকায় বিভিন্ন সুবিধা পাওয়ার লোভ দেখিয়ে তারা মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি চাকরি কিংবা অনুদানের নামে প্রতারণা করে থাকে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।জনসচেতনতা স্বরপ কোনো প্রতিষ্ঠানের সাথে অর্থ লেনদেনের আগে প্রতিষ্ঠানটির বৈধতা যাচাই করার আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে ভুক্তভোগীরা দ্রুত তদন্ত করে প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে আরও অনেক চাকুরি প্রত্যাশিত নারী চাকুরি ও সহায়তার আশায় প্রতারণার শিকার হতে পারেন।
ভোরের আকাশ/ র.ই