মহব্বতকে খাইছি, তোরেও খাইমু’: এক ফোনালাপেই ৩ বছরের ক্লুলেস মার্ডারের রহস্যভেদ

হবিগঞ্জের মাধবপুরে চাঞ্চল্যকর মো. মহব্বত আলী (৩৯) নিখোঁজের পর দীর্ঘ তিনটি বছর পেরিয়ে গেলেও ঘটনাটির কোনো সুনির্দিষ্ট কূলকিনারা হচ্ছিল না। কোনো প্রত্যক্ষদর্শী বা প্রাথমিক সূত্র না থাকায় ২০২৩ সালের এই অমীমাংসিত ঘটনাটি ভেদ করা বেশ জটিল হয়ে পড়েছিল।
তবে অপরাধী যতই চতুরতার সাথে অপরাধ ঢাকুক না কেন, কোনো না কোনো প্রমাণ বা সূত্র ঠিকই পেছনে রেখে যায়—যা আবারও প্রমাণিত হলো। অবশেষে একটি গোপন অডিও রেকর্ড ও আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির নিখুঁত বিশ্লেষণের মাধ্যমে দীর্ঘ তিন বছর ধরে ধামাচাপা পড়ে থাকা এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করেছে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)।
প্রেমের প্রস্তাবের জেরে ঠাণ্ডা মাথায় পরিকল্পিত এই হত্যাকাণ্ডের পর লাশ গুম করা হয়েছিল পার্শ্ববর্তী এক প্রবাসীর বাড়ির সেপটিক ট্যাংকে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে মূল পরিকল্পনাকারী স্বামী-স্ত্রীসহ চার আসামিকে গ্রেফতারের পর বেরিয়ে এসেছে গা শিউরে ওঠা সব তথ্য।
তদন্ত সূত্র জানায়, ২০২৩ সালের ৩০ জুলাই রাতে মাধবপুরের রামনগর গ্রামের কৃষক ও স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যদাতা হিসেবে পরিচিত মহব্বত আলী হঠাৎ নিখোঁজ হন। ঘটনার পর ভিকটিমের পরিবারের পক্ষ থেকে ২০২৩ সালের ১৮ই আগস্ট মাধবপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়, যার নম্বর ১৯। মামলাটি দীর্ঘদিন তদন্তাধীন থাকলেও কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি বা সূত্র মিলছিল না। পরবর্তীতে হবিগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার মো. তারেক মাহমুদের নির্দেশনা এবং সার্বিক তত্ত্বাবধানে এই দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত মামলার তদন্তভার আনুষ্ঠানিক অনুমতি ও নির্দেশনায় হস্তান্তর করা হয় জেলা গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি)। দায়িত্ব পান ডিবির চৌকস তদন্তকারী কর্মকর্তা নিরস্ত্র এসআই মো. সাইফুল ইসলাম।
ডিবি পুলিশের আভিযানিক দল দায়িত্ব নিয়েই তথ্য-প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং পূর্ববর্তী রেকর্ডগুলো নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ শুরু করে। এরই মধ্যে তদন্তকারী কর্মকর্তার হাতে আসে খুনিদের অজান্তেই রেখে যাওয়া সেই অদৃশ্য প্রমাণ—ভিকটিম মহব্বত আলীর নিখোঁজের পেছনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গোপন অডিও রেকর্ড। ওই অডিও রেকর্ডে অভিযুক্ত শাহ আলমকে অন্য এক ব্যক্তিকে হুমকি দিয়ে বলতে শোনা যায়, ‘মহব্বতকে খাইছি, তোরেও খাইমু।’ এই একটিমাত্র ফোনালাপের সূত্র ধরে ডিবি পুলিশ কল রেকর্ড বিশ্লেষণ, গোয়েন্দা নজরদারি এবং ঘটনাস্থলে প্রাথমিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে নিশ্চিত হয় যে, রামনগর গ্রামের শাহ আলমের স্ত্রী জাহানারা বেগমের সাথে ভিকটিমের নিখোঁজের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
পুলিশি তদন্তে বেরিয়ে আসে, ভিকটিম মহব্বত আলী দীর্ঘদিন ধরে শাহ আলমের স্ত্রী জাহানারা বেগমকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন। বিষয়টি ক্ষুব্ধ জাহানারা তার স্বামী শাহ আলমকে জানালে তারা মহব্বত আলীকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার সুপরিকল্পিত ফাঁদ পাতেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৩০ জুলাই রাতে জাহানারা বেগম কৌশলে প্রেমের প্রস্তাবে সাড়া দেওয়ার অভিনয় করে মহব্বত আলীকে তাদের ঘরে ডেকে আনেন। মহব্বত ঘরে প্রবেশ করা মাত্রই সেখানে ওত পেতে থাকা স্বামী শাহ আলম এবং তার আপন দুই ভাতিজা মো. ইয়াসিন মিয়া ও জয়নাল মিয়া তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। চারজন মিলে মহব্বত আলীকে শ্বাসরোধ করে নির্মমভাবে হত্যা করেন। হত্যাকাণ্ড নিশ্চিত করার পর লাশ চিরতরে লুকিয়ে ফেলতে তারা পার্শ্ববর্তী প্রবাসী রুনা বেগমের ফাঁকা বাড়ির সেপটিক ট্যাংকের ভেতরে মরদেহটি ফেলে ঢাকনা বন্ধ করে দেন।
প্রযুক্তির জাল ও অডিও রেকর্ডের সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার পর গত ২৯ অক্টোবর মাধবপুর পৌর এলাকায় প্রথম চিরুনি অভিযান চালায় ডিবির আভিযানিক দল। সেখান থেকে গ্রেফতার করা হয় মামলার অন্যতম প্রধান সন্দেহভাজন জাহানারা বেগমকে। পুলিশের নিবিড় জেরার মুখে জাহানারা ঘটনার সত্যতা ও নিজের সম্পৃক্ততা স্বীকার করেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করা হয় তার স্বামী শাহ আলমকে। পরবর্তীতে রামনগর এলাকা থেকেই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া শাহ আলমের দুই ভাতিজা ইয়াসিন ও জয়নাল মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতার ও নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের পর মূল আসামি শাহ আলমের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এবং তার দেখানো পথ ধরে প্রবাসীর বাড়ির সেপটিক ট্যাংক থেকে মহব্বত আলীর দেহাবশেষ (কঙ্কাল) ও তার পরিধেয় কাপড়ের আলামত উদ্ধার করে পুলিশ। দীর্ঘদিন পর এই রহস্যময় হত্যাকাণ্ডে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় অগ্রগতি।
পুলিশ জানায়, গ্রেফতারকৃত মূল পরিকল্পনাকারী জাহানারা বেগম ও তার স্বামী শাহ আলম ইতিমধ্যেই বিজ্ঞ আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় নিজেদের দোষ স্বীকার করে খুনের আদ্যোপান্ত ও লোমহর্ষক জবানবন্দি দিয়েছেন। কঙ্কাল উদ্ধার ও মূল আসামিদের আইনের আওতায় আনার মাধ্যমে মামলার জট খুললেও এবং মূল রহস্য উদঘাটিত হলেও এই মামলার তদন্ত কার্যক্রম এখনো চলমান রয়েছে।
ভোরের আকাশ/ এনউব