চাঁপাইনবাবগঞ্জ
আমের বাম্পার ফলনের হাতছানি, মুকুলে ছেয়ে গেছে বাগান

শীতের তীব্রতা কাটিয়ে প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে আমের রাজধানীখ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জে বইতে শুরু করেছে মুকুলের মৌ মৌ ঘ্রাণ। জেলার দিগন্তজোড়া আমবাগানগুলোতে এখন সোনালি মুকুলের সমারোহ। শাখা-প্রশাখায় আমের এই আগাম বারতা দেখে বাগান মালিকদের চোখে বড় ফলনের স্বপ্ন থাকলেও, নেপথ্যে কাজ করছে একরাশ দুশ্চিন্তা।
সার ও কীটনাশকের আকাশচুম্বী দাম, নতুন জাতের পোকার উপদ্রব এবং ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন জেলার হাজার হাজার আম চাষি। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রায় ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে আমের চাষাবাদ হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৮০ শতাংশ গাছে মুকুল চলে এসেছে।
আম্রপালি, বারি-৪, কাটিমন ও ফজলিসহ সব জাতের গাছেই এবার মুকুলের আধিক্য দেখা যাচ্ছে। আবহাওয়ার পরিস্থিতি এখন পর্যন্ত অনুকূলে থাকায় গতবারের তুলনায় ফলন বেশি হওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখছে কৃষি বিভাগ।
মাঠ পর্যায়ের চিত্র বলছে, স্বপ্ন আর শঙ্কা এখানে হাত ধরাধরি করে চলছে।
আম চাষি মো. আমিনুল ইসলাম ডালিম ও মো. দবির আহমেদ জানান, এ বছর বাজারে সার ও কীটনাশকের দাম অস্বাভাবিক বেশি। এর ওপর যুক্ত হয়েছে ‘উকনা’ পোকার মতো নতুন ধরনের কিছু সাকার পোকা। চাষিদের অভিযোগ, প্রচলিত সাধারণ কীটনাশক প্রয়োগ করেও এই পোকা দমন করা যাচ্ছে না। ফলে মুকুল রক্ষায় বাড়তি অর্থ খরচ করতে হচ্ছে তাদের।
এছাড়া প্রতি বছরই আম পাকার মৌসুমে সিন্ডিকেটের কারসাজি আর কোল্ড স্টোরেজ বা আধুনিক হিমাগার না থাকায় চাষিদের ‘পানির দরে’ আম বিক্রি করতে হয়। লোকসান এড়াতে তারা জেলায় আধুনিক আম সংরক্ষণাগার স্থাপন এবং সরাসরি আম রপ্তানির স্থায়ী ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
সকাল-সন্ধ্যা কুয়াশা আর দুপুরে কড়া রোদের এই বিচিত্র আবহাওয়ায় মুকুল টিকিয়ে রাখতে নাওয়া-খাওয়া ভুলে ব্যস্ত সময় পার করছেন বাগান কর্মীরা। বাগান কর্মী মোঃ মিনার বলেন, "এই সময়ে সঠিক পরিচর্যা না করলে মুকুল পচে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। রোদ আর কুয়াশার লুকোচুরিতে ছত্রাকনাশক ও অন্যান্য বালাইনাশক স্প্রে করতে আমরা বাড়তি নজর দিচ্ছি।"
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মো. ইয়াহিন আলী জানান, এখন পর্যন্ত আমের মুকুলের জন্য আবহাওয়া বেশ উপযোগী। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এবার জেলায় আমের বাম্পার ফলন হবে। নতুন পোকা ও বালাই দমনে তিনি কৃষকদের ‘ইমিডাক্লোরোপিড’ বা ‘ডেল্টামেথ্রিন’ গ্রুপের ওষুধ সঠিক মাত্রায় ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন। একই সাথে নিরাপদ আম উৎপাদনের জন্য রাসায়নিকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জৈব বালাইনাশক ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম কেবল এই জেলার সম্পদ নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতির বড় একটি অংশ। চাষিদের দাবি, মুকুল যেন শেষ পর্যন্ত তাদের মুখে হাসি ফোটাতে পারে, সেজন্য সরকারকে সরাসরি বাজার তদারকি করতে হবে। বিশেষ করে কীটনাশকের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং আম রপ্তানির পথ সুগম করা গেলে এই সোনালি মুকুলই বয়ে আনবে কয়েকশ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা।
ভোরের আকাশ/ র.ই