৩৬ বছর ৯ মাস শিক্ষকতা শেষে আবেগঘন বিদায়

কেউ এসেছেন কৈশোরের স্মৃতি নিয়ে, কেউ ফিরেছেন জীবনের প্রথম শিক্ষকের কাছে। কারও চোখে পুরোনো দিনের আনন্দ, আবার কারও চোখে বিদায়ের বেদনা। সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের পদচারণায় শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) বিকেলে কুড়িগ্রামের রাজারহাটের দুধখাওয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় যেন ফিরে পেয়েছিল তার হারানো দিনগুলো। বিদ্যালয়ের মাঠ পরিণত হয়েছিল আবেগঘন এক মিলনমেলায়।
বিদ্যালয়ের তিন যুগ পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের সঙ্গে ছিল সদ্য অবসর নেওয়া প্রধান শিক্ষক মো. সাহিদুল ইসলামের অবসরোত্তর বিদায়ী সংবর্ধনা। দীর্ঘ ৩৬ বছর ৯ মাস ৮ দিন একই বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করা এই শিক্ষককে বিদায় জানাতে সাবেক শিক্ষার্থীরা আয়োজন করেন ব্যতিক্রমী সম্মাননার। সম্মাননা স্মারকের পাশাপাশি তাঁকে পালসার মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন উপহারসামগ্রী দেওয়া হয়।
বিদ্যালয়টির সঙ্গে সাহিদুল ইসলামের সম্পর্ক কেবল একজন প্রধান শিক্ষক হিসেবে নয়; তাঁর কর্মজীবনের বড় একটি অধ্যায়জুড়ে জড়িয়ে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির বেড়ে ওঠার গল্পও। ১৯৮৮ সালে আরডিআরএসের ‘শিক্ষা নিলয়’ হিসেবে দুধখাওয়া গ্রামে বিদ্যালয়টির পাঠদান কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তীতে নিবন্ধনের জন্য নতুন করে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলে ১৯৯০ সালের ২৬ জানুয়ারি সাহিদুল ইসলাম নিয়োগ পান। পরদিন, ২৭ জানুয়ারি তিনি বিদ্যালয়ে যোগ দেন।
১৯৯৫ সালে বিদ্যালয়টি নিবন্ধিত হয়। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে ২০১৩ সালের ১ জানুয়ারি সরকারি প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয় এটি। এই দীর্ঘ পথচলায় বিদ্যালয়ের সঙ্গে নিজের জীবনকেও একাকার করে নিয়েছিলেন সাহিদুল ইসলাম। তাঁর নেতৃত্বে বিদ্যালয়টি রাজারহাট উপজেলায় মডেল বিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ১৯৯৫ সাল থেকে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিয়মিতভাবে সাধারণ ও ট্যালেন্টপুল বৃত্তি অর্জন করে আসছে। কর্মদক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি রাজারহাট উপজেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবেও ভূষিত হন।
বিদায়ের মুহূর্তে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন সাহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এই বিদ্যালয়ের সঙ্গে আমার জীবনের দীর্ঘ সময় কেটে গেছে। বিদ্যালয়ের জমিদাতা রহমতুল্লাহ আজ আমাদের মাঝে নেই। এটাই আমার সবচেয়ে কষ্টের বিষয়। সবাই তাঁর জন্য দোয়া করবেন, আল্লাহ যেন তাঁকে জান্নাতবাসী করেন।’
সাবেক ছাত্র সেকেন্দার আলী লিমনের কাছে সাহিদুল ইসলাম শুধু একজন শিক্ষক নন, শৈশবের একজন অভিভাবকও। তিনি বলেন, ‘স্যার শিক্ষার্থীদের নিজের সন্তানের মতো স্নেহ করতেন। এই বিদ্যালয়েই আমার শিক্ষাজীবনের শুরু। স্যারের নিরলস প্রচেষ্টা, পরিশ্রম ও ত্যাগ এবং এলাকাবাসীর সহযোগিতায় বিদ্যালয়টি আজকের অবস্থানে এসেছে।’
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি ও আয়োজক কমিটির সদস্য মোস্তাফিজার রহমান মন্ডল সাথী বলেন, সাহিদুল ইসলাম দীর্ঘ ৩৬ বছর ৯ মাস ৮ দিন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর দক্ষ নেতৃত্ব ও নিরলস প্রচেষ্টায় বিদ্যালয়টি একটি মডেল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তাঁর বিদায়ে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসীর মধ্যে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। তাঁরা তাঁর অবসরোত্তর জীবনের সুস্থতা, দীর্ঘায়ু ও আনন্দময় জীবন কামনা করেন।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৩টায় অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে শিক্ষক আহাম্মদ আলী মন্ডলের সভাপতিত্বে আলোচনা সভা হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হৃদয় কৃঞ্চ বর্মন। সাবেক ছাত্র আবুল কালাম আজাদ ও ফারুক হোসেনের যৌথ সঞ্চালনায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা আশরাফুজ্জামান, বিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র চিকিৎসক মো. আব্দুস ছালামসহ অন্যরা।
অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
ভোরের আকাশ/সু.পা