পানছড়িতে সেনাবাহিনীর চক্ষু ক্যাম্পে ৬০০ জনকে চিকিৎসা প্রদান, ৭০ ছানি শনাক্ত

দুই বছর ধরে চোখে ঝাপসা দেখছিলেন তিনি। ধীরে ধীরে কমছিল দৃষ্টিশক্তি। সংসারের কাজ থেকে স্বাভাবিক চলাফেরা—সবই কঠিন হয়ে উঠেছিল। অর্থসংকট ও দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে দূরে গিয়ে চিকিৎসা করানোও সম্ভব হয়নি। অবশেষে খাগড়াছড়ির পানছড়িতে বিনামূল্যের চক্ষু চিকিৎসা ক্যাম্পে এসে জানতে পারেন, চোখে ছানি পড়েছে। শুধু রোগ শনাক্তই নয়, বিনামূল্যে অস্ত্রোপচারের আশ্বাসও পেয়েছেন তিনি। তার মতো আরও শত শত মানুষের চোখে এখন নতুন আশার আলো।
পাহাড়ের দুর্গম জনপদে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাসেবা যখন অনেকের নাগালের বাইরে, তখন মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বিনামূল্যের বিশেষায়িত চক্ষু চিকিৎসা। খাগড়াছড়ি সদর সেনা জোনের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উদ্যোগে এবং রোটারি ক্লাব ও চট্টগ্রাম লায়ন্স চক্ষু হাসপাতালের সহযোগিতায় আয়োজিত দিনব্যাপী এ ক্যাম্পে প্রায় ৬০০ নারী-পুরুষ চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন। এর মধ্যে ৭০ জনের বেশি রোগীর চোখে ছানি শনাক্ত হয়েছে। তাদের চট্টগ্রামে নিয়ে গিয়ে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ছানি অস্ত্রোপচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বুধবার সকালে পানছড়ি মডেল মসজিদ কমপ্লেক্সে শুরু হয় এ চক্ষু চিকিৎসা ক্যাম্প। পানছড়ি ও আশপাশের দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মানুষের উপস্থিতিতে সকাল থেকেই মুখর হয়ে ওঠে ক্যাম্প প্রাঙ্গণ। কেউ এসেছেন চোখে ঝাপসা দেখা নিয়ে, কেউ দীর্ঘদিনের চোখের ব্যথা কিংবা দৃষ্টিজনিত জটিলতা নিয়ে। বয়সের ভারে দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া প্রবীণদেরও চিকিৎসকদের কাছে দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে দেখা যায়।
ক্যাম্পে চিকিৎসকেরা রোগীদের চোখ পরীক্ষা, রোগ নির্ণয়, প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও চিকিৎসাসেবা দেন। অনেকেই প্রথমবারের মতো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে চোখ পরীক্ষা করানোর সুযোগ পান। প্রয়োজন অনুযায়ী রোগীদের ওষুধ ও পরামর্শ দেওয়া হয়। আর যাদের উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন, তাদের পরবর্তী চিকিৎসার বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়।
ক্যাম্পে আসা এক ছানি রোগী বলেন, “দুই বছর ধরে আমি চোখে ঠিকমতো দেখতে পারি না। ডাক্তার পরীক্ষা করে বলেছেন ছানি হয়েছে। অপারেশনও বিনামূল্যে করে দেবে শুনে খুব ভালো লাগছে। সেনাবাহিনীর প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ।”
আরেক উপকারভোগী বলেন, “অনেকদিন ধরে চোখের সমস্যা ছিল। দূরে গিয়ে ডাক্তার দেখানো সম্ভব হয়নি। এখানে এসে বিনামূল্যে ডাক্তার দেখাতে পেরেছি। এতে আমাদের অনেক উপকার হয়েছে।”
পানছড়ি ও আশপাশের দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মানুষের জন্য এ চিকিৎসা ক্যাম্প যেন একই সঙ্গে চিকিৎসার খরচ ও দূরত্বের বাধা দূর করেছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে যেখানে অনেককে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়, সেখানে নিজ এলাকায় চিকিৎসাসেবা পাওয়ায় স্বস্তি ফিরেছে রোগীদের মধ্যে।
ক্যাম্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল ছানি রোগীদের বিনামূল্যে অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা। শনাক্ত হওয়া রোগীদের প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে চট্টগ্রামে নিয়ে গিয়ে অস্ত্রোপচার করা হবে। এতে দীর্ঘদিন ধরে দৃষ্টিশক্তি হারানোর শঙ্কায় থাকা অনেক মানুষের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ক্যাম্পের কার্যক্রম পরিদর্শন করেন পানছড়ি সাবজোন কমান্ডার মেজর মাহমুদ, সাবজোন উপ-অধিনায়ক ক্যাপ্টেন আশিকসহ সংশ্লিষ্ট সেনা কর্মকর্তারা। তারা চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের সঙ্গে কথা বলেন এবং ক্যাম্পের সার্বিক কার্যক্রমের খোঁজখবর নেন।
পাহাড়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভৌগোলিক দুর্গমতা বড় চ্যালেঞ্জ। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি সড়ক, দূরবর্তী বসতি ও সীমিত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অনেক মানুষ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যেতে পারেন না। বিশেষ করে চোখের রোগ দীর্ঘদিন অবহেলায় রাখলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
চট্টগ্রাম লায়ন্স আই ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হাসপাতালের অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জন ডা. শুভ চক্রবর্তী বলেন, পুরো মেডিকেল টিম নিয়ে তারা ক্যাম্পে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন। সকাল থেকেই বিভিন্ন ধরনের রোগী চিকিৎসা নিতে আসছেন। এখন পর্যন্ত ৭০ জনের বেশি ছানি রোগী শনাক্ত হয়েছেন। তাদের চট্টগ্রামের হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে বিনামূল্যে ছানি অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করা হবে।
খাগড়াছড়ি সদর জোনের মেডিকেল অফিসার ক্যাপ্টেন তানজিম ইসলাম অর্ণব বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, খাগড়াছড়ি জোনের ব্যবস্থাপনায় এবং চট্টগ্রাম লায়ন্স চক্ষু হাসপাতালের সহযোগিতায় পানছড়িতে এ বিনামূল্যের চক্ষু চিকিৎসা শিবিরের আয়োজন করা হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মানুষের দোরগোড়ায় উন্নত চক্ষু চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়াই এর মূল লক্ষ্য।
খাগড়াছড়ি সদর জোন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল আমিনুর রহমান বলেন, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বিভিন্ন কার্যক্রমে গিয়ে তারা দেখেছেন, অনেক মানুষ চোখের সমস্যায় ভুগছেন এবং চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ কারণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশন ও রিজিয়ন হেডকোয়ার্টারের উদ্যোগে এবং লায়ন্স ক্লাব চিটাগংয়ের সহযোগিতায় এ চক্ষু শিবিরের আয়োজন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “আজ প্রায় ৬০০ রোগীকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। ছানিসহ জটিল রোগীদের চট্টগ্রামে নিয়ে গিয়ে অপারেশনের মাধ্যমে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”
এক দিনের এ ক্যাম্প শেষ হবে, চিকিৎসকরাও ফিরে যাবেন। তবে যাদের চোখে নতুন করে আলো ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তাদের কাছে দিনটি থেকে যাবে দীর্ঘদিন। পাহাড়ের নীরব জনপদে এমন উদ্যোগ তাই শুধু চিকিৎসাসেবা দেওয়ার আয়োজন নয়; এটি মানুষের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার এবং অন্ধকার সরিয়ে আলোর পথ দেখানোর এক মানবিক প্রয়াস।
ভোরের আকাশ/সু.পা