উত্তরে পানিবন্দি কয়েক হাজার পরিবার, নদীগর্ভে বিলীন শতাধিক ঘরবাড়ি

তিস্তার পানি বাড়ছে, আবার কমছে। এমন পরিস্থিতিতে সপ্তাহখানেক আগে তিস্তার তীর সংলগ্ন বাঁধে ভাঙন দেখা দেয়। পানি কমা বাড়ার সাথে সাথে ভাঙ্গন আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। গত ২৪ ঘন্টায় উত্তরের ৫ জেলা রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও নীলফামারীতে তিস্তার ভাঙ্গন এর শিকার হয়েছে অন্তত ১১০ টি পরিবার বলে জানিয়েছেন রংপুর অঞ্চলের পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবিব। তিনি জানান,তিস্তার মধ্যবর্তী চরে যেসব পরিবার বাস করেন সেখানকার অন্তত ৭ হাজার পরিবার এই পাঁচ জেলায় পানিবন্দী হয়ে রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, গেল সোমবার রাতে দেশের বৃহৎ সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমার ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় ভাঙন ভয়াবহ রূপ ধারণ করে।
তীব্র স্রোতের কারণে রংপুরের গংগাচড়া ও কুড়িগ্রামের রাজারহাটে নবনির্মিত তীর সংরক্ষণকাজের প্রায় ২০০ মিটার নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এতে ৩৫টি ঘরবাড়ি ভেঙে যাওয়াসহ লোকালয়ে পানি ঢুকে প্রায় এক হাজার পরিবারের ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়েছে। নতুন করে ঘরবাড়ি হারানোর আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটছে ১১ গ্রামের দেড় হাজার পরিবারের। অন্যদিকে তলিয়ে গেছে আমন ধানের বীজতলাসহ নানা ধরনের সবজি ক্ষেত।
স্থানীয়রা জানান, গত কয়েক দিন ধরেই তিস্তার পানি দ্রুত ওঠানামা করছে। এরই মধ্যে আকস্মিক বন্যা, তীব্র স্রোত এবং হঠাৎ পানি কমে যাওয়ার কারণে নদীতীরজুড়ে ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়েছে। এতে দেড় হাজার পরিবারের বসতভিটা, বিস্তীর্ণ ফসলি জমি, দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক হুমকির মুখে পড়েছে। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে অন্তত শতাধিক ঘরবাড়ি।
ঘরবাড়ি হারানো পরিবারগুলোর আর্তনাদে নদী পাড়ের আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। তারা বলছেন সরকার আসে সরকার যায়, তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না, তারা রিলিফ চান না চান নদী খননসহ স্থায়ী বাঁধ।
সরেজমিনে দেখা যায়, রংপুর জেলার গঙ্গাচড়ার তালপট্টি নরশিং এলাকায় প্রায় দুই কিলোমিটার তীর সংরক্ষণকাজ করা হয়েছে। বাঁধ হওয়ায় চলাচলসহ তিন গ্রামের মানুষ আশায় বুক বাঁধে। কিন্তু সম্প্রতি তিস্তার স্রোতে সেই বাঁধ নদীতে বিলীন হয়ে যায়। যার কারণে ওই গ্রামগুলোর বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
পশ্চিম হরিণচড়া এলাকার আব্দুল মতিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বাঁধ হইতে না হইতেই কয় মাসের মাথায় সেটাও নদীত চলি গেইল, এইবার হামারগুলার মরণ ছাড়া কোন বুদ্দি (উপায়) নাই।
তালপট্রি এলাকার রুকনুজ্জামান বললেন, ‘বাঁধ দেওয়ার পর বসতভিটায় টিকি থাকার স্বপ্ন দেকচেন, সেই বাঁধও ভাঙ্গি গেইল। এ্যালা এ্যাটে থাকি চলি যাওয়া ছাড়া হামার আর কোনো পথ নাই। তবে ভাঙন শুরু হওয়ার পরপরেই যদি পানি উন্নয়ন বোর্ড দ্রুত ব্যবস্থা নিতো তাহলে হয়তো বাঁধটা ঠেকানো যেতো বলে অভিযোগ ওই এলাকাবাসীর।
লালমনিরহাটের চর গোড্ডিমারীর অমিচন বেওয়া বলেন, স্বামী হারানোর আট বছরে তিস্তা তার ঘরবাড়ি ৮ বার কেড়ে নিল, এখন তিনি পথের ভিখারী। শুধু অমিচন বেওয়াই নন,উত্তরের তিস্তা বেষ্টিত পাঁচ জেলার হাজারো মানুষের চোখের পানিতে ভারী হচ্ছে দুঃখের নানা কথা। তারা কোথায় যাবেন কি করবেন ভেবে পাচ্ছেন না।
রংপুরের বিভাগীয় কমিশনার শহীদুল ইসলাম বলেন, পানিবন্দী পরিবার গুলোর মাঝে শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে, পাশাপাশি ভাঙ্গন রোধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা ও দেওয়া হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের রংপুর অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবিব বলেন, কয়েক দিন ধরে উত্তরের পাঁচটি জেলায় ভাঙন শুরু হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে সেখানে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙনরোধের কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়াও পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে আরও জিও ব্যাগ ফেলা হবে এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভোরের আকাশ/এনউব