বরিশালের অসহায় মানুষের বন্ধু সাজ্জাদ পারভেজ

বন্ধুদের সম্পর্কের টান যখন কেবল আড্ডাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না, তখন তা রূপ নিতে পারে এক বিরাট মানবিক শক্তিতে।
এমন ভাবনার বাস্তব রূপ দিয়েছে ‘৮৪ ইভেন্ট গ্রুপ’। নিজেদের জমা করা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় দিয়ে দেশের ১০টি জেলার ৩৫৬টি অসহায়, দুস্থ ও নিম্নআয়ের পরিবারকে স্বাবলম্বী করে এক অনন্য নজির গড়েছে সংগঠনটি।
সংগঠনটির সংক্ষিপ্ত পরিচিতি: প্রতিষ্ঠাকাল ও যাত্রা: ২০২৩ সালে মাত্র ৩২ জন সদস্য নিয়ে কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে সদস্য সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫২ জনে।
সদস্যদের প্রোফাইল: ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, প্রবাসী (যেমন আমেরিকা প্রবাসী শওকত মির্জা), আইনজীবী এবং ইঞ্জিনিয়ারদের মতো বিভিন্ন পেশাজীবী।
তহবিল গঠন পদ্ধতি: প্রতি মাসে প্রত্যেক সদস্যের নির্ধারিত ১,০০০ টাকা সঞ্চয় এবং ঐচ্ছিক অতিরিক্ত আর্থিক অনুদান।
মোট ব্যয় ও অগ্রগতি: প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এ পর্যন্ত সদস্যদের নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় ২৬ লাখ টাকা মানবিক কাজে ব্যয় হয়েছে।
সহায়তার ধরন ও কর্মসংস্থান সংস্থান সংগঠনটি এককালীন আর্থিক সহায়তার চেয়ে স্থায়ী আয়ের পথ তৈরিতে প্রাধান্য দেয়। তাদের মূল কার্যক্রমগুলো হলো:
স্থায়ী উপার্জনের মাধ্যমে স্বাবলম্বীকরণ: কর্মক্ষম ব্যক্তিদের নতুন রিকশা প্রদান, নারীদের সেলাই মেশিন কিনে দেওয়া, ছোট ব্যবসার জন্য ক্যাশ প্রদান ও দোকান তৈরি করা।
শিক্ষা ও মানবিক সাহায্য: অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার খরচ, পোশাক ও শিক্ষা উপকরণের দায়িত্ব নেওয়া।
মৌসুমি ও জরুরি সহায়তা: মহামারি ও দুর্যোগকালীন খাদ্য সহায়তা, ঈদের জাকাত ও নতুন পোশাক, শীতবস্ত্র, বর্ষাকালে রেইনকোট বিতরণ এবং প্রত্যন্ত এলাকায় সুপেয় পানির জন্য টিউবওয়েল স্থাপন।
সংবাদের মূল বক্তব্য ও উক্তি: সংগঠনটির উদ্যোক্তা ও বরিশালের সমাজসেবা অধিদপ্তরের আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধ্যক্ষ সাজ্জাদ পারভেজ জানান, "আমাদের উদ্দেশ্য কেবল সাময়িক টাকা দিয়ে সাহায্য করা নয়, বরং তাদের আয়ের স্থায়ী পথ তৈরি করা যেন তারা ভবিষ্যতে অন্যের ওপর নির্ভরশীল না থাকেন। মাঠপর্যায়ে সঠিক দুস্থ ব্যক্তি নির্বাচন করেই এই সহায়তা দেওয়া হয়।"
একই প্রত্যয় ব্যক্ত করে আমেরিকার প্রবাসী সদস্য শওকত মির্জা এবং ভোলার ইঞ্জিনিয়ার শাহাদাত জানান, দূর-দূরান্তে অবস্থান করলেও দেশের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারাটাই তাদের বন্ধুত্বের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
বদলে যাওয়া জীবনের বাস্তব গল্প: ফাতেমা (বরিশাল): করোনায় স্বামী চাকরি হারানোর পর ৮৪ ইভেন্ট গ্রুপের আর্থিক সহযোগিতায় ঘুরে দাঁড়ান। বর্তমানে বরিশাল সার্কিট হাউসের সামনে সফলভাবে একটি ভাতের হোটেল পরিচালনা করছেন।
লাল মিয়া: বয়সের কারণে সিটি করপোরেশনের চাকরি হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন। সংগঠনটির পক্ষ থেকে নতুন রিকশা পেয়ে তিনি এখন পরিবার নিয়ে ভালো আছেন।
আমেনা এবং মোহাইমেনা: অর্থের অভাবে পার্কের ব্যালেন্স পার্কে ফুল বিক্রি করতেন। সংগঠনটি তাদের ফুল বিক্রি বন্ধ করে স্কুলে ভর্তি, ড্রেসসহ পড়াশোনার পূর্ণ দায়িত্ব নেওয়ায় তিনি এখন স্বাবলম্বী হওয়ার নতুন স্বপ্ন দেখছেন।
বন্ধুত্বের এই শক্তি প্রমাণ করেছে, সদিচ্ছা ও সুসংগঠিত উদ্যোগ থাকলে সামান্য সঞ্চয় দিয়েও সমাজ থেকে অভাব দূর করা সম্ভব।
ভোরের আকাশ/রই