মহাদেবপুরে দুই শিশুকে হত্যার অভিযোগ, বিচার না পেয়ে দিশেহারা পরিবার

নওগাঁর মহাদেবপুরে ৩ বছরের শিশু নাঈম ও ৫ বছরের আরাফাতের রহস্যজনক মৃত্যু ঘিরে এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। পরিবারের দাবি, এটি সাধারণ কোনো সলিল সমাধি নয়; বরং এক পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড।
একটি ধর্ষণের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার জেরে চরম প্রতিশোধ নিতেই নিষ্পাপ এই দুই শিশুকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়েছে। ঘটনার কয়েকমাস পেরিয়ে গেলেও তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় এবং আসামিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিহতের স্বজনরা।
নিহত নাঈম মহাদেবপুরের বিনোদপুর পশ্চিমপাড়া গ্রামের মো. সিরাজুল ইসলামের ছেলে। সিরাজুল ইসলাম স্থানীয় একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক। অন্য শিশু আরাফাত একই গ্রামের আইজুল হকের নাতি। তারা দুজনই ছিল সারাদিনের খেলার সাথি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত বছরের ১৬ জুলাই ওই গ্রামের ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরীকে স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ওয়াশরুমে নিয়ে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হয়। সেই দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করে নাঈমের বড় ভাই নাহিদ ইসলাম সাগর। পরবর্তীতে ভিডিওটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে অভিযুক্ত পক্ষ ও তাদের প্রভাবশালী সহযোগীরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং সাগরের পরিবারকে দেখে নেওয়ার হুমকি দিতে থাকে।
নিহতদের পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১ সেপ্টেম্বর সকালে নাঈম তার প্রিয় লাল প্লাস্টিকের হাতপাখা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়। সঙ্গী হয় প্রতিবেশী শিশু আরাফাত। অভিযোগ রয়েছে, পূর্ব শত্রুতার জেরে ঘাতকরা নাঈমকে কৌশলে বাড়ির ভেতরে ডেকে নিয়ে গলা টিপে হত্যা করে।
খেলার সাথী ৫ বছরের শিশু আরাফাত বিষয়টি দেখে ফেলায় তাকেও শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলা হয়। পরে প্রমাণ লোপাটের উদ্দেশ্যে দুই শিশুর মরদেহ পাশের পুকুরে ফেলে দেয় তারা। স্থানীয় এক নারী পুকুরে মরদেহ ভাসতে দেখে চিৎকার করলে গ্রামবাসী তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন।
স্বজনদের দাবি, নাঈমের গলায় স্পষ্ট আঘাতের চিহ্ন ছিল এবং পানিতে ডুবে মারা গেলে পেটে যে পরিমাণ পানি থাকার কথা, তার কিছুই পাওয়া যায়নি। এছাড়া ঘটনার দিন এক সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে ভেজা প্যান্ট পরিহিত অবস্থায় ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে, যা খুনের সন্দেহে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ঘটনার পর স্থানীয় থানায় সহযোগিতা না পেয়ে নিহতের পরিবার আদালতের দ্বারস্থ হয়। বর্তমানে ৯০৪ নম্বর মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে এবং পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) মামলাটি তদন্ত করছে। তবে বারবার তারিখ পরিবর্তন হলেও তদন্ত প্রতিবেদন জমা না পড়ায় ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কিত ভুক্তভোগীরা। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেদন জমার তারিখ থাকলেও তা পিছিয়ে আগামী ১৫ মার্চ নির্ধারণ করা হয়েছে।
সন্তানহারা মা ডুকরে কেঁদে কেঁদে বলেন, “আমার কলিজার টুকরাদের যারা মেরেছে, তাদের ফাঁসি চাই। আমরা গরিব মানুষ বলে কি আমাদের সন্তানের রক্তের দাম নেই? আমরা কি বিচার পাব না?”
এ বিষয়ে পিবিআই-এর তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট ও পারিপার্শ্বিক আলামত বিশ্লেষণ করে দ্রুতই আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। গ্রামের সাধারণ মানুষের দাবি, এই জোড়া খুনের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক।
ভোরের আকাশ/ র.ই