রাজারহাটে ১৫ দিনে নদীগর্ভে বিলীন ১৯ বাড়ি, আতঙ্কে দুই শতাধিক পরিবার

“চোখের নিমিষে বাড়িভিটা নদী খায়া গেলো। চারটা ঘর কোনোরকমে সরাইছি। তিনটা আমগাছ, একটা জামগাছ কাটার আগেই নদীতে ডুইবা গেল।
এই শোক সইতে না পেরে বাড়ি ভাঙার তিন দিন পরই বাবা কাদের আলী মারা গেলেন। এখন অন্যের জমিতে ঘর তুলে আছি। আমাগো কষ্ট কেউ দ্যাখে না।”
বুকভরা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের চর বিদ্যানন্দ গ্রামের বাসিন্দা কাফি (৩৫)। সম্প্রতি তিস্তার ভাঙনে তার বসতভিটা বিলীন হয়েছে।
সোমবার (৬ জুলাই) সরেজমিনে চর বিদ্যানন্দ ও চর তৈয়বখাঁ গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তিস্তার তীব্র ভাঙন চলছে। পানি কিছুটা কমলেও নদীর প্রবল স্রোত ও বাতাসের চাপে মুহূর্তেই ফসলি জমি, গাছপালা ও বসতভিটা নদীগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে। ভাঙন থেকে রেহাই পায়নি বাদাম, আমনের বীজতলা, পাট, ভুট্টা, মরিচ ও বিভিন্ন ধরনের সবজির ক্ষেতও।
স্থানীয়দের দাবি, গত ১৫ দিনে চর বিদ্যানন্দ ও চর তৈয়বখাঁ—এই দুই গ্রামে অন্তত ১৯টি বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
এর মধ্যে চর বিদ্যানন্দে কাফি, আব্দুল জলিল, রশিদুল ইসলাম, গনি মুন্সী, মোতালিব, আশরাফুল, লোকমান, জয়নাল, আব্দুস সালাম, রফিকুল ও সফিকুলের বাড়ি নদীতে চলে গেছে। অন্যদিকে চর তৈয়বখাঁ গ্রামে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন মোস্তফা কামাল, রোস্তম আলী, সাত্তার, জহুরুল, আইয়ুব আলী, মোকছেদ, রওশন আরা ও ফকরুল ইসলাম।
ভাঙন প্রতিরোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে সোমবার দুই গ্রামের শতাধিক মানুষ তিস্তা নদীর তীরে ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন করেন। এতে বক্তব্য দেন মাঈদুল ইসলাম, শরিফুল ইসলাম ও আশরাফুল হকসহ স্থানীয়রা।
চর তৈয়বখাঁ গ্রামের রোস্তম আলী বলেন, “এ নিয়ে পাঁচবার নদী আমার বাড়ি নিয়ে গেছে। এবার আড়াই বিঘা পাট ও আমনের বীজতলাও নদীতে বিলীন হয়েছে। অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়েছি, কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি সহায়তা পাইনি।”
চর বিদ্যানন্দ গ্রামের আব্দুল জলিল জানান, পূর্বচর বিদ্যানন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দুটি মসজিদ বর্তমানে ভাঙনের মুখে রয়েছে। দ্রুত প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা না নিলে বিদ্যালয়টি নদীতে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে এলাকার শিশুদের লেখাপড়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। এছাড়া আরও দুই শতাধিক পরিবার ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
বিদ্যানন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তাইজুল ইসলাম বলেন, “আমার ইউনিয়নের প্রায় ৭৫ শতাংশ এলাকা ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এখন চর বিদ্যানন্দ ও চর তৈয়বখাঁ গ্রামের ভাঙন রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার সীমানা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।”
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, জেলায় বর্তমানে প্রায় ৪০টি স্থানে নদীভাঙন চলছে। গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় প্রায় ৩০টি পয়েন্টে দুই লাখ জিওব্যাগ ফেলা হয়েছে। তবে চরাঞ্চলে কাজের জন্য এখনো পৃথক কোনো বরাদ্দ না থাকায় সেখানে ভাঙনরোধে কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি।
ভোরের আকাশ/ র.ই