চেঙ্গী নদীতে ভাসানো হলো কল্প জাহাজ, আকাশে উড়ল রঙিন ফানুস

নদীর বুকে ভাসছে রঙিন কাগজে তৈরি দৃষ্টিনন্দন কল্প জাহাজ। অন্যদিকে, নদীর তীর থেকে আকাশের দিকে উড়ে যাচ্ছে একের পর এক রঙিন ফানুস। ঢাক-ঢোল, বাদ্যবাজনা আর তরুণ-তরুণীদের উচ্ছ্বাসে মুখর চারপাশ।
চেঙ্গী নদীর বুকে এমন বর্ণিল আয়োজন ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। ধর্মীয় বিশ্বাস, শত বছরের ঐতিহ্য আর পাহাড়ের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য মেলবন্ধনে খাগড়াছড়িতে উদযাপিত হয়েছে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) বিকেলে খাগড়াছড়ি শহরের চেঙ্গী নদীতে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী রিছিমি বা কল্প জাহাজভাসা উৎসব। নদীর তীরে উড়ানো হয় রঙিন ফানুস। এ উৎসব দেখতে নদীর দুই তীরে ভিড় করেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আয়োজন হলেও উৎসবে যোগ দেন বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ। সব মিলিয়ে চেঙ্গী নদীর তীর হয়ে ওঠে পাহাড়ের সম্প্রীতি, ঐতিহ্য ও উৎসবের এক বর্ণিল মিলনমেলা।
প্রবারণা পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই খাগড়াছড়ি শহরের বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহারে চলে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান। বিকেলে উৎসবের মূল আয়োজন শুরু হয় শহরের য়ংড বৌদ্ধ বিহার থেকে বের করা মঙ্গল শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে। শোভাযাত্রাটি শাপলা চত্বর ঘুরে রাজ্যমনিপাড়া হয়ে চেঙ্গী নদীর তীরে গিয়ে শেষ হয়। পরে নদীর বুকে ভাসানো হয় কাগজের তৈরি দৃষ্টিনন্দন কল্প জাহাজ। একই সময়ে নদীর তীরে উড়ানো হয় উজ্জ্বল ফানুস।
শত শত তরুণ-তরুণীর অংশগ্রহণে উৎসবের এক মিলনমেলা।
প্রবারণা পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই খাগড়াছড়ি শহরের বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহারে চলে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান। বিকেলে উৎসবের মূল আয়োজন শুরু হয় শহরের য়ংড বৌদ্ধ বিহার থেকে বের করা মঙ্গল শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে। শোভাযাত্রাটি শাপলা চত্বর ঘুরে রাজ্যমনিপাড়া হয়ে চেঙ্গী নদীর তীরে গিয়ে শেষ হয়। পরে নদীর বুকে ভাসানো হয় কাগজের তৈরি দৃষ্টিনন্দন কল্প জাহাজ। একই সময়ে নদীর তীরে উড়ানো হয় উজ্জ্বল ফানুস।
শত শত তরুণ-তরুণীর অংশগ্রহণে উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়। নদীর বুকে ভাসমান কল্প জাহাজ আর আকাশে উড়ন্ত ফানুসের দৃশ্য উপভোগ করতে নদীর তীরে জড়ো হন নানা বয়সী মানুষ। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের পাশাপাশি উৎসবজুড়ে ছিল আনন্দ, উচ্ছ্বাস ও পারস্পরিক সম্প্রীতির আবহ।
আড়াই হাজার বছরের ঐতিহ্য স্মরণে কল্প জাহাজভাসা বৌদ্ধভিক্ষুদের ভাষ্য অনুযায়ী, কল্প জাহাজভাসা উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে গৌতম বুদ্ধের বৈশালী গমনের একটি ধর্মীয় কাহিনি। বৌদ্ধ ঐতিহ্যে বর্ণিত আছে, প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে বৈশালী রাজ্যে অনাবৃষ্টি, খরা ও দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে মানুষ ও জীবজন্তুর দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়। এমন পরিস্থিতিতে বৈশালীর রাজার আমন্ত্রণে শিষ্যদের নিয়ে সেখানে যান গৌতম বুদ্ধ।
বৌদ্ধ ঐতিহ্য অনুযায়ী, গৌতম বুদ্ধ ‘রত্নসূত্র’ পাঠের মাধ্যমে রাজ্যকে অশুভ প্রভাব থেকে রক্ষায় ভূমিকা রাখেন। তাঁর আগমনে বৈশালীর মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে বলে ধর্মীয় কাহিনিতে উল্লেখ রয়েছে।
বৌদ্ধভিক্ষুদের বর্ণনা অনুযায়ী, বৈশালী থেকে ফেরার পথে সর্পদেবতারা ৫০০টি নৌকায় গৌতম বুদ্ধ ও তাঁর শিষ্যদের নদী পার করে দেন। সেই ঘটনাকে স্মরণ করেই বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষ প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে কল্প জাহাজভাসা উৎসব পালন করে আসছেন।
সম্প্রীতির বন্ধনে পাহাড়ের মানুষ: ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি এ আয়োজন পাহাড়ের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধন আরও দৃঢ় করে তুলছে। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস ও ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এ উৎসবে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণ পাহাড়ের বহুত্ববাদী সংস্কৃতিরই প্রতিফলন।
ধর্মীয় গুরুদের মতে, এ ধরনের আয়োজন শুধু ধর্মীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণই করে না, বরং মানুষে মানুষে সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতির চর্চার মধ্য দিয়ে একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে এসব উৎসব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
চেঙ্গী নদীর বুকে ভাসমান কল্প জাহাজ আর আকাশে উড়ন্ত রঙিন ফানুস যেন সেই বার্তাই ছড়িয়ে দেয়—ধর্ম যার যার, উৎসব ও সম্প্রীতি সবার। পাহাড়ের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি আর মানুষের সম্মিলিত আনন্দে প্রবারণা পূর্ণিমার এ আয়োজন হয়ে ওঠে খাগড়াছড়ির ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির এক অনন্য প্রতিচ্ছবি।
ভোরের আকাশ/ এনউব