ক্যান্সারে বাকরুদ্ধ শরিফের মুখে ‘মা’ ডাক শুনতে সাহায্যের আকুতি মায়ের

লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে গলার ক্যান্সারে আক্রান্ত ২৪ বছর বয়সী শরিফ কথা বলার ক্ষমতা হারিয়েছেন। অর্থাভাবে বন্ধ হওয়ার পথে তাঁর চিকিৎসা। ছেলের মুখে আবারও ‘মা’ ডাক শোনার আশায় দিন কাটছে মা নাজমা বেগমের। পরিবারের সামর্থ্য না থাকায় এখন সমাজের বিত্তবান ও হৃদয়বান মানুষের সহযোগিতার অপেক্ষায় রয়েছে পরিবারটি।
রায়পুর পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমর উদ্দিন হাজী বাড়ির বাসিন্দা সাইফুল ইসলামের বড় ছেলে মো. শরিফ। যে বয়সে স্বপ্ন দেখার কথা, পরিবারকে ভালো রাখার কথা, সেই বয়সেই দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে কঠিন জীবনসংগ্রামে নেমেছেন তিনি। একসময় পরিবারের সঙ্গে হাসি-আনন্দে কথা বলতেন, ভাগাভাগি করতেন নিজের স্বপ্নের কথা। কিন্তু ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার পর হারিয়েছেন কথা বলার ক্ষমতা। এখন নীরব চোখে তাকিয়ে থাকেন স্বজনদের দিকে।
শরিফ ছিলেন পরিবারের বড় ছেলে। তাঁর আয় ঘিরেই পরিবার দেখেছিল সচ্ছলতার স্বপ্ন। ছোট ভাই-বোনের ভবিষ্যৎ আর সংসারের অভাব ঘোচানোর আশায় চার-পাঁচ বছর আগে ধারদেনা করে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। উদ্দেশ্য ছিল পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো, অভাবের সংসারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা।
কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। বিদেশে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন শরিফ। দুই বছরও সেখানে থাকতে পারেননি। অসুস্থ শরীর নিয়ে দেশে ফিরতে হয় তাঁকে। এরপর ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে থমকে যায় তাঁর স্বাভাবিক জীবন। পরিবারের স্বপ্নগুলোও যেন আটকে যায় অনিশ্চয়তার বেড়াজালে।
শরিফের বাবা সাইফুল ইসলাম একসময় সিএনজি চালিয়ে সংসার চালাতেন। কিন্তু দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার পর এখন আর আগের মতো গাড়ি চালাতে পারেন না। একদিকে বাবার কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া, অন্যদিকে ছেলের ব্যয়বহুল চিকিৎসা সব মিলিয়ে দিশাহারা পরিবারটি। যে ছেলে একসময় সংসারের ভরসা ছিলেন, আজ তাঁর চিকিৎসার জন্যই অন্যের সহযোগিতা প্রয়োজন।
সন্তানের অসুস্থতা কোনো মায়ের কাছেই সহজে মেনে নেওয়ার বিষয় নয়। আর সেই সন্তান যখন নিজের কষ্টের কথাটুকুও মুখে বলতে পারে না, তখন মায়ের বুকের ভেতর জমে থাকা যন্ত্রণা ভাষায় প্রকাশ করাও কঠিন।
নাজমা বেগমের দিন কাটে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে। তাঁর চোখে এখনো একটিই স্বপ্ন—ছেলে সুস্থ হয়ে উঠবে, আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরবে। ঘরের নীরবতা ভেঙে একদিন আগের মতো মাকে ডেকে উঠবে। সেই পরিচিত ডাক শোনার আশাতেই দিন পার করছেন তিনি।
কিন্তু স্বপ্ন আর বাস্তবতার মাঝখানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থসংকট। প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যয় বহন করার সামর্থ্য নেই পরিবারের। ফলে শরিফের চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
স্থানীয় যুবদল নেতা মাহবুব হোসেন ফাহিম বলেন, “শরিফের অসুস্থতার খবর কয়েক দিন আগে জানতে পেরেছি। এরপর সাধ্যমতো প্রাথমিক সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু বর্তমানে তাঁর যে শারীরিক অবস্থা, তাতে চিকিৎসার জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন। সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে এলে তাঁর চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।”
একই ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ও শরিফের প্রতিবেশী আবুল বাশার বলেন, “ছেলেটি চার-পাঁচ বছর আগে ধারদেনা করে বিদেশে গিয়েছিল। অসুস্থ হয়ে ফিরে আসায় সেখানে দুই বছরও থাকতে পারেনি। তার বাবা সিএনজি চালিয়ে সংসার চালাতেন। তিনিও দুর্ঘটনার পর আগের মতো গাড়ি চালাতে পারেন না। ছেলেটিই ছিল পরিবারের ভরসা। এখন সে নিজেই অসুস্থ, অথচ টাকার অভাবে চিকিৎসা করানো কঠিন হয়ে পড়েছে।”
শরিফের পরিবার সমাজের বিত্তবান, প্রবাসী, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন ও দেশ-বিদেশে থাকা হৃদয়বান মানুষের কাছে সহযোগিতা কামনা করেছে। সামর্থ্য অনুযায়ী আর্থিক সহায়তা পেলে তাঁর চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশা পরিবারের।
একজন মায়ের কাছে সন্তানের সুস্থতার চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে? নাজমা বেগমের চাওয়াও খুব বেশি নয়। তিনি চান, তাঁর ছেলে সুস্থ হয়ে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরুক। ঘরের নীরবতা ভেঙে একদিন আবারও ডেকে উঠুক—‘মা’।
সেই একটি ডাক শোনার আশাতেই আজও ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন নাজমা বেগম। শরিফের চিকিৎসায় সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিলে হয়তো তাঁর পরিবার ফিরে পেতে পারে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন।
ভোরের আকাশ/সু.পা