মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় পড়ে আছে ৪৬৪ যানবাহন, নষ্ট হচ্ছে কোটি টাকার সম্পদ

মোটরসাইকেল থেকে প্রাইভেটকার, বাস-ট্রাক থেকে অটোরিকশা—বিভিন্ন ধরনের যানবাহন পড়ে আছে থানা ও আদালত প্রাঙ্গণে। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, এটি কোনো পরিত্যক্ত যানবাহনের ভাগাড়। কিন্তু এসব যানবাহনের বেশিরভাগই বিভিন্ন মামলার আলামত হিসেবে জব্দ করা।
বছরের পর বছর খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকায় রোদ-বৃষ্টি ও অযত্নে নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান সম্পদ। সময়মতো নিলাম বা নিষ্পত্তি না হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রকৃত মালিকরা। একই সঙ্গে সম্ভাব্য রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।
গাইবান্ধা জেলার সাতটি থানা ও আদালত প্রাঙ্গণে বর্তমানে প্রায় ৪৬৪টি জব্দ করা যানবাহন পড়ে রয়েছে। এর মধ্যে অনেক যানবাহন দীর্ঘদিন ধরে মামলার আলামত হিসেবে পড়ে থাকায় নষ্ট হওয়ার পথে।
জেলা পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আদালতের মালখানায় ১১৫টি যানবাহন রয়েছে। এ ছাড়া গাইবান্ধা সদর থানায় ৫৭টি, সাদুল্লাপুর থানায় ২৬টি, সুন্দরগঞ্জ থানায় ৪২টি, গোবিন্দগঞ্জ থানায় ৯০টি, পলাশবাড়ী থানায় ৫৫টি, ফুলছড়ি থানায় ৯টি ও সাঘাটা থানায় ৩০টি যানবাহন পড়ে আছে।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধের মামলার আলামত হিসেবে এসব যানবাহন জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে চোরাই ও কাগজপত্রবিহীন যানবাহনও রয়েছে। কোনো কোনো যানবাহন বছরের পর বছর ধরে মামলার আলামত হিসেবে পড়ে আছে। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক যানবাহনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশে মরিচা ধরেছে। কিছু যানবাহন ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।
একসময় যেসব যানবাহনের বাজারমূল্য ছিল উল্লেখযোগ্য, দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় সেগুলোর মূল্যও কমে যাচ্ছে। এতে প্রকৃত মালিকদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি মূল্যবান সম্পদ নষ্ট হচ্ছে। দ্রুত নিলাম বা আইনগত নিষ্পত্তি না হওয়ায় থানা ও আদালত প্রাঙ্গণের জায়গাও দখল হয়ে আছে।
এ বিষয়ে গাইবান্ধার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) শরীফ আল রাজীব পিপিএম বলেন, মামলার আলামত হিসেবে জব্দ করা যানবাহনগুলো যাতে অযত্নে নষ্ট না হয়, সে বিষয়ে আদালতের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। যেসব মামলা নিষ্পত্তির পর্যায়ে রয়েছে, সেসব মামলার আলামত দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তবে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আদালত প্রাঙ্গণে পড়ে থাকা যানবাহনের নিলাম কার্যক্রম চলছে ধীরগতিতে। গাইবান্ধা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের নাজির রেজাউল করিম সরকার জানান, সর্বশেষ ২০২০ সালের নভেম্বরে যানবাহন নিলামের কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও নতুন করে নিলাম অনুষ্ঠিত হয়নি। তবে বর্তমানে আবারও নিলামের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
আইনজীবীদের মতে, যেসব মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়েছে, সেসব মামলার আলামত দ্রুত নিলামের আওতায় আনা প্রয়োজন। এতে আদালত ও থানার জায়গার সংকট কমার পাশাপাশি দীর্ঘদিন পড়ে থেকে যানবাহন নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও কমবে।
গাইবান্ধা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মিজানুর রহমান মিজান বলেন, যেসব মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়েছে, সেসব মামলার আলামত আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দ্রুত নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। এতে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় রোধের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা যানবাহনগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা ও নিলাম কার্যক্রমে ধীরগতির কারণে বছরের পর বছর ধরে পড়ে থাকা যানবাহনের মূল্য কমছে। দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি ও নিলাম কার্যক্রম সম্পন্ন করা গেলে এসব যানবাহনের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মূল্যবান সম্পদ রক্ষা এবং সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব আদায়ও সম্ভব হবে।
ভোরের আকাশ/সু.পা