হাটে ‘কালা চাঁদ’ ও ‘লাল বাহাদুরের রাজত্ব

ট্রাম্প, নেতানিয়াহু, মেসি কিংবা রোনালদো নানা নামের গরু নিয়ে প্রতি বছরই কোরবানির হাটে তৈরি হয় আলাদা আকর্ষণ। তবে এবার কক্সবাজারের কোরবানির বাজারে সব তারকাখ্যাতিকে ছাপিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে বিশাল আকৃতির দুই গরু ‘কালা চাঁদ’ ও ‘লাল বাহাদুর’। যুদ্ধ কিংবা ফুটবল মাঠে নয়, হাটের রাজত্ব দখলের লড়াইয়ে যেন মুখোমুখি এই দুই দানবাকৃতি ষাঁড়।
২৩ মণ ও ২২ মণ ওজনের এই দুই গরুর দাম হাঁকা হয়েছে যথাক্রমে ৮ লাখ ও সাড়ে ৬ লাখ টাকা। শুধু তারাই নয়, হাট মাতাতে প্রস্তুত রয়েছে ‘মিস্টার লাল’, ‘কালো বুলেট’ ও ‘সুলতান’-ও। বিশাল গড়ন, আকর্ষণীয় সৌন্দর্য ও চড়া দামের কারণে প্রতিদিনই এসব গরু দেখতে ভিড় করছেন ক্রেতা ও দর্শনার্থীরা।
সাদা-কালো রঙের মিশেলে গড়া সুঠাম দেহের অধিকারী ‘কালা চাঁদ’। খামার সূত্রে জানা গেছে, গরুটির ওজন ২৩ মণের বেশি। দৈর্ঘ্যে সাড়ে ১১ ফুট এবং উচ্চতায় সাড়ে ৬ ফুটেরও বেশি। অন্যদিকে লাল রঙের ‘লাল বাহাদুর’-এর ওজন ২২ মণের বেশি। দৈর্ঘ্য সাড়ে ১০ ফুট এবং উচ্চতা সাড়ে ৫ ফুটের কাছাকাছি।
শুধু ‘কালা চাঁদ’ ও ‘লাল বাহাদুর’ নয়, ‘মিস্টার লাল’, ‘কালো বুলেট’ ও ‘সুলতান’-ও আকর্ষণ কেড়েছে দর্শনার্থীদের। গত তিন বছর ধরে বিশেষ যত্নে এসব গরুকে কোরবানির হাটের উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন খামার সংশ্লিষ্টরা।
গরুগুলোর পরিচর্যায় নিয়োজিত শ্রমিক দিলদার হোসেন বলেন,“আমাদের খামারের ৪০টি গরুর মধ্যে কালা চাঁদ, মিস্টার লাল, কালো বুলেট, সুলতান ও লাল বাহাদুর সবচেয়ে আকর্ষণীয়। ছোটবেলা থেকেই অনেক যত্ন করে এদের বড় করা হয়েছে। প্রতিদিন চারবার গোসল করানোর পাশাপাশি তিন বেলা খাবার দেওয়া হয়। বড় গরুগুলো দৈনিক প্রায় ২০ কেজি খাবার খায়। আমরা কোনো ভেজাল বা কেমিক্যালযুক্ত খাবার দিই না। ভুসি, ভুট্টা, খৈল ও সবুজ ঘাসসহ দেশীয় খাবার দিয়েই এগুলো লালন-পালন করা হচ্ছে।”
আরেক শ্রমিক আজিজুর রহমান বলেন, সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে গরুগুলো লালন-পালন করা হচ্ছে। কোনো ধরনের কেমিক্যাল বা ক্ষতিকর ওষুধ ব্যবহার করা হয় না।”
বিশাল আকৃতির এসব গরু এক নজর দেখতে প্রতিদিনই খামারে ভিড় করছেন উৎসুক মানুষ। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন। দূর-দূরান্ত থেকেও আসছেন সম্ভাব্য ক্রেতারা। তবে দাম শুনে অনেকেই বিস্মিত হচ্ছেন।
বাহারছড়া এলাকার তরুণ সাঈদ মোহাম্মদ বলেন,“খামারের কথা শুনে বন্ধুদের নিয়ে গরু দেখতে এসেছি। এখানে ৩ লাখ থেকে শুরু করে ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত দামের গরু রয়েছে। সবগুলো গরুই বেশ বড় ও আকর্ষণীয়। তবে আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে লাল বাহাদুরকে। এখন বাবার সঙ্গে কথা বলে পরে সিদ্ধান্ত নেব।”
গরু কিনতে আসা সাদেকুর রহমান বলেন,“লাল বাহাদুর ও কালা চাঁদ দেখে খুব ভালো লেগেছে। মাশাআল্লাহ, গরুগুলো অনেক বড় ও সুন্দর। ২২-২৩ মণ ওজনের এসব গরু সত্যিই নজরকাড়া।”
কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের সমিতিপাড়াস্থ ‘মায়ের দোয়া এগ্রো ফার্ম’-এর স্বত্বাধিকারী নুরুল ইসলাম জানান, এবার কোরবানির হাটে ট্রাম্প, নেতানিয়াহু, মেসি কিংবা রোনালদো নামের গরুগুলোকেও ছাড়িয়ে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ তৈরি করেছে ‘কালা চাঁদ’ ও ‘লাল বাহাদুর’।
তিনি বলেন, আমাদের খামারের কালা চাঁদের দাম ধরা হয়েছে ৮ লাখ টাকা, লাল বাহাদুরের দাম সাড়ে ৬ লাখ এবং কালো বুলেটের দাম প্রায় সাড়ে ৭ লাখ টাকা। গত বছর কক্সবাজার জেলায় সেরা খামারি হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলাম। তখন প্রায় ৮৪ লাখ টাকার গরু বিক্রি হয়েছিল। এবার লক্ষ্য রয়েছে এক কোটি টাকার বেশি বিক্রির।
তিনি আরও জানান, খামারে প্রস্তুত করা ৪০টি গরুর মধ্যে পাঁচটি বিশেষ আকর্ষণ। এসব গরুর ওজন ২১ থেকে ২৩ মণের মধ্যে। এছাড়া ১৬ থেকে ১৮ মণ ওজনের আরও বেশ কয়েকটি গরু রয়েছে। বিশাল গড়ন আর চড়া দামে হাট মাতানো এই গরুগুলো শেষ পর্যন্ত কার ঘরে যায়, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।
জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্যমতে, জেলায় এবার কোরবানির জন্য গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়াসহ পশুর চাহিদা ১ লাখ ৩৪ হাজার ২৯৫টি। খামারগুলোতে বিক্রির উদ্দেশ্যে রাখা পশু আছে
১ লাখ ৫৮ হাজার ১৬৩টি। জেলায় এবার কোরবানির পশু কেনাবেচার জন্য স্থায়ী ও মৌসুমি হাটবাজার ৫৬টি। এদিকে হাটে বিক্রির জন্য আনা গবাদি পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষাসহ অসুস্থতার চিকিৎসা দিতে মাঠ পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ ভেটেরিনারি চিকিৎসকের সমন্বয়ে গঠন করা হয়েছে ২৭টি মেডিকেল টিম।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এএম খালেকুজ্জামান বলেন, ‘গোখাদ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশীয় পদ্ধতিতে গরু মোটাতাজা করতে খরচ বেড়েছে বলে খামারিরা বলছেন। আমরা খামারিদের পরামর্শ দিয়েছি কাঁচা ঘাস ও খড় বেশি পরিমাণে খাওয়ানোর জন্য। এতে খরচ কমবে।’
ভোরের আাকাশ/এনউব