সুন্দরবনে ৫৯ দস্যুর আত্মসমর্পণ, অস্ত্র-গুলি উদ্ধার

সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করতে একের পর এক আত্মসমর্পণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তাদের কেউ কেউ পুনরায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন। মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) নতুন করে সুন্দরবনের পাঁচটি বাহিনীর ৫৯ জন দস্যু র্যাবের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। তাদের মধ্যে আটজন আগে আত্মসমর্পণ করে পুনর্বাসিত হওয়ার পরও আবার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১১টায় খুলনায় র্যাব-৬ কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক অতিরিক্ত আইজিপি মো. আহসান হাবীব পলাশ। আগের দিন আত্মসমর্পণ করা ৫৯ দস্যুর বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে এ ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়।
আত্মসমর্পণ করা ৫৯ জনের মধ্যে বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর ১৬ জন, আনরুল বাহিনীর ১৩ জন, আফজাল ওরফে দুলাভাই বাহিনীর ১৫ জন, আফতার বাহিনীর আটজন ও মিজান বাহিনীর সাতজন রয়েছেন।
এ সময় সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করা বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদের তথ্যও তুলে ধরা হয়। র্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়, অভিযানে ৫৯টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৫৪১ রাউন্ড তাজা গুলি, ১৪টি খালি কার্তুজ ও সাতটি ওয়াকিটকি উদ্ধার করা হয়েছে।
উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে চারটি শটগান, ৪৭টি ওয়ান শুটার গান, চারটি পাইপগান, তিনটি এয়ারগান ও একটি পয়েন্ট ২২ বোর রাইফেল।
র্যাব জানায়, সুন্দরবনের জলদস্যু ও বনদস্যু দমনে র্যাব, কোস্ট গার্ড, স্থানীয় প্রশাসন, নৌপুলিশ ও বন বিভাগের সমন্বয়ে ‘অপারেশন রি-স্টার্ট, পিস ইন সুন্দরবন’ নামে বিশেষ অভিযান চলছে। গত ২ মার্চ থেকে ধারাবাহিকভাবে এ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
র্যাব মহাপরিচালক আহসান হাবীব পলাশ জানান, সুন্দরবনে বর্তমানে চার থেকে পাঁচটি দস্যু বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। এসব বাহিনীর সদস্যদের অপরাধের পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর চেষ্টা চলছে।
তিনি জানান, এ পর্যন্ত সুন্দরবনের ৩১৮ জন দস্যু আত্মসমর্পণ করেছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৩০ জন পরবর্তীতে আবার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন।
আত্মসমর্পণের পর পুনর্বাসনের সুযোগ পেয়েও কেউ কেউ কেন অপরাধে ফিরছেন, সেটি নতুন করে ভাবনার বিষয় বলে উল্লেখ করেন র্যাব মহাপরিচালক। সামাজিক চাপ, রাজনৈতিক কারণ, সচেতনতার অভাব, স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে অনীহা ও হয়রানির ভয়—এসব কারণে কেউ কেউ আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন বলে জানান তিনি।
আহসান হাবীব পলাশ বলেন, আত্মসমর্পণকারীদের সবাইকে শতভাগ স্বাভাবিক জীবনে ফেরানো সম্ভব হয়নি। সার্বক্ষণিক নজরদারি করা সম্ভব না হলেও র্যাবের গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। আত্মসমর্পণের পর কেউ আবার অপরাধে জড়াচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে এবার পুনর্বাসন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, আত্মসমর্পণকারীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে আগের চেয়ে উন্নত পুনর্বাসন ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে আলোচনা চলছে।
আত্মসমর্পণকারীদের অহেতুক মামলা ও হয়রানি প্রসঙ্গে তিনি জানান, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা প্রমাণ ছাড়া কাউকে আটক কিংবা মামলা দেওয়া উচিত নয়। ভবিষ্যতে আত্মসমর্পণকারীরা যাতে অহেতুক হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক করা হয়েছে।
সুন্দরবনের নিরাপত্তা জোরদারে সেখানে একটি র্যাব ব্যাটালিয়ন গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথাও জানান তিনি। বর্তমানে সুন্দরবন এলাকায় কোস্ট গার্ডের একটি ক্যাম্প রয়েছে। সুন্দরবনবাসী চাইলে সেখানে র্যাবের একটি ব্যাটালিয়ন গঠনের জন্য সরকারের কাছে আবেদন করা যেতে পারে বলেও জানান র্যাব মহাপরিচালক।
এ সময় দেশব্যাপী বিশেষ অভিযান শুরুর কথাও জানান তিনি। র্যাবের নেতৃত্ব ও নির্দেশনায় পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যৌথভাবে এ অভিযান পরিচালনা করবে। এর কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। আগামী এক-দুই দিনের মধ্যে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে বলে জানান তিনি।
অভিযানে তথ্য দিয়ে সহযোগিতার জন্য গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানান র্যাব মহাপরিচালক। তথ্যদাতাদের পরিচয় গোপন রাখা ও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করবে বলেও জানান তিনি।
সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত রাখতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অব্যাহত থাকবে বলেও জানান আহসান হাবীব পলাশ। একই সঙ্গে উপকূলীয় মানুষের নিরাপত্তা, বনজীবীদের জীবন-জীবিকা ও দেশের মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।
ভোরের আকাশ/সু.পা