অভয়নগরে ভৈরব নদ নাব্যতা হারিয়ে ঝুঁকির মুখে শিল্প বাণিজ্য

যশোরের অভয়নগরের ভৈরব নদ দখলে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী, ঘাট ও শিল্প মালিকরা। তারা নদীর নাব্যতা সংকটের অজুহাত দেখিয়ে নদী দখলের প্রতিযোগিতা শুরু করেছেন।
কৃত্রিম চর বানিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে প্রায় অর্ধশত ঘাট। ফলে নদীর কিছু কিছু স্থানের বাঁক পরিবর্তন হয়েছে। ভাঙ্গনের কবলে নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে শতশত বিঘা ফসলি জমি। নিঃশ্ব হয়েছে অনেক পরিবার। নওয়াপাড়া নদী বন্দর কর্তৃপক্ষের তদারকির অভাবে সরকার হারাচ্ছে কোটি টাকার রাজস্ব।
নদী তার আগের চেহারা ফিরে পাবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন নওয়াপাড়া নদী বন্দর কর্তৃপক্ষ। উপজেলা নির্বাহী অফিসার বলেছেন, সরকারি রাজস্ব বাড়াতে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। অবৈধ দখল রোধে দ্রুত কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। কোন প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না। ব্যবসায়ী ও ঘাট মালিকরা বলছেন নদীর নাব্যতা সংকটের কারণে ঘাটে জাহাজ ও কার্গো ভিড়তে পারছে না। সেজন্য মাটি ও বালু ফেলে নদীর মধ্যে বাঁশ এবং কাঠ দিয়ে পল্টুন করতে হচ্ছে।
দেশের অন্যতম ব্যবসায়ী মোকাম হিসেবে অভয়নগরের নওয়াপাড়ার পরিচিতি দেশব্যাপী। এখানে নৌ, সড়ক ও রেল পথ থাকায় ব্যবসা সমৃদ্ধ শহর হিসেবে গড়ে উঠেছে। উপজেলার রাজঘাট থেকে বসুন্দিয়া ইউনিয়নের আফ্রা ঘাট পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার বিস্তৃত নওয়াপাড়া নদী বন্দর। এই ১৫ কিলোমিটারের মধ্যে চলছে অবৈধ স্থাপনা ও নদী দখলের প্রতিযোগিতা।
নওয়াপাড়া নদী বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্র জানায়, ২০০৭ সাল থেকে তাদের কার্যক্রম শুরু। বর্তমানে ৯টি সরকারি জেটি আছে। এছাড়া ব্যক্তি মালিকায় রয়েছে প্রায় একশত ঘাট। ২০১৯-২০ অর্থ বছরে নওয়াপাড়া নদী বন্দরের প্রায় ৫ কিলোমিটার (রাজঘাট থেকে ভাঙ্গাগেট) গাইডওয়াল নির্মাণ, স্থায়ী জেটি ও কাস্টম ভবন নির্মানের পরিকল্পনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয় এই পরিকল্পনার অনুমোদন দিলে সরকারি রাজস্ব অনেকাংশে বেড়ে যাবে।
নওয়াপাড়া সার, সিমেন্ট ও খাদ্যশস্য ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহজালাল হোসেন বলেন, নওয়াপাড়ায় প্রায় ৪০০ ব্যবসায়ী আছেন। নদ বাঁচাতে না পারলে এখানে ব্যবসা থাকবে না। ইতিমধ্যে এখানে গম আসছে না, চাল আসছে না, কয়লা আসা কমে গেছে। ব্যবসায়ীরা অন্যত্র চলে যাচ্ছেন।
স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, নওয়াপাড়ার প্রভাবশালী ধনী ব্যবসায়ীরা অধিকাংশই বাইরের। তারা মুনাফা লুটতে ভৈরব নদকে ধ্বংস করছে। এমনই এক প্রতিষ্ঠান সরকার গ্রুপ। তালতলা ঘাট, নূর সিমেন্ট ফ্যাক্টরির সম্পূর্ণ জায়গা জুড়ে ঘাট-গোডাউন, মহাকাল চেঙ্গুটিয়া ঘাট-গোডাউনসহ ৪/৫ টি ঘাট নদের প্রায় মাঝামাঝি পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রতিষ্ঠানটি কোন নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে শুধুমাত্র ব্যবসায়িক স্বার্থ হাসিল করার জন্য নদ দখলের প্রতিযোগিতায় নেমে শিল্প শহর নওয়াপাড়ার ভবিষ্যত ধ্বংস করছে।
সরেজিমনে নওয়াপাড়া নদী বন্দরের ভাঙ্গাগেট মশরহাটি গ্রামে ভৈরব সেতু এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নদী তীরবর্তী পরশ আটা, ময়দা, সূজি মিল নামক একটি প্রতিষ্ঠান নদের প্রায় একশত ফুটের মতো দখল করে ফেলেছে। প্রতিষ্ঠানটি প্রথমে কৃত্রিম চর বানিয়ে তার মধ্যে লং বুম দিয়ে মাটি ভরাট করছে। পাশেই আক্তার এগ্রো নামের একটি বন্ধ কারখানাও নদীর অর্ধেক প্রায় দখল করে ফেলেছে। তারা বাঁশের খুটি গেঁড়ে পুরাতন টিন দিয়ে নদীর মধ্যে বাধ দিয়েছে। পরে ইট, বালু, পাথর ও মাটি দিয়ে ভরাট করে চর উঠেছে বলে দখল করেছে। এরপর সেই স্থানে ঘাট নির্মাণ করার চেষ্টা করছে। তাদের এই নদী দখলের ফলে ওই স্থানে নদীর বাঁক পাল্টে গেছে। যে কারণে নদীর অপর পাড়ে ব্যাপক ভাঙ্গন সৃষ্টি হয়েছে, যা এখনও অব্যাহত আছে।
নওয়াপাড়া নদী বন্দরের উপ-পরিচালক মাসুদ পারভেজ জানান, যারা কৃত্রিম পন্থায় চর বানিয়ে নদী দখল করছে, তাদের তালিকা করে নোটিশ করা হয়েছে এবং পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ অচিরেই শুরু করা হবে।
ভোরের আকাশ/ এনউব