গাইবান্ধায় পোকা দমনে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে আলোক ফাঁদ

কৃষকের গায়ে গতরে ফলানো মাঠের ফসল পুরোটা তো ঘরে আসেই না, কোনো কোনো সময় কৃষকদের জন্য একটি আবাদ হয়ে উঠে ব্যর্থ প্রকল্পের মতো। আর এটার কারণ প্রায় সকলেরই জানা। অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, খরা, অসময়ে বন্যা, শিলা বৃষ্টিসহ নানা কারণে ফসলের চরম ক্ষতি হয়। সেইসবের সঙ্গে জমিতে পোকার উপদ্রবেও উৎপাদিত ফসলের বেশ ক্ষতি সাধিত হয়ে থাকে। আপাতত, পোকার উপদ্রব থেকে ফসলকে রক্ষার একটি ভালো ও কার্যকর কৌশল চোখে পড়েছে গাইবান্ধায়। যার নাম 'আলোক ফাঁদ'।
গাইবান্ধায় চলতি বোরো (ইরি) মৌসুমে ধানে উপকারি ও অপকারি পোকার উপস্থিতি শনাক্ত করতে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এই আলোক ফাঁদ পদ্ধতি। মাঠের পাশে স্থাপন করা এই ফাঁদে বাল্বের আলোতে আকৃষ্ট হয়ে পোকারা এসে ফাঁদে পড়ে যায়। এতে ক্ষতিকর পোকার উপস্থিতি সহজে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাচ্ছে।
জেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বোরো (ইরি) ধানের জমিতে কৃষকদের সহায়তায় এবং কৃষি অফিসের তত্ত্বাবধানে স্থাপন করা হয়েছে আলোক ফাঁদ। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা এ কাজে কৃষকদের উৎসাহিত করছেন।
গাইবান্ধা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, জেলায় চলতি বোরো মৌসুমে ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লক্ষ ২৯ হাজার ২০ হেক্টর,এর মধ্যে অর্জিত হয়েছে ১ লক্ষ ২৯হাজার ২০ হেক্টর। এ মৌসুমে রোপণ করা ধানের জাতের মধ্যে রয়েছে ব্রিধান ২৮, ২৯. ৫০, ৫৮, ৭৪, ৮১, ৮৪, ৮৮, ৮৯, ৯২, ১০০, ১০১, ১০২, ১০৫, ১০৮, এসএল এইট এইচ, পারটেক্স ৬. নাফকো ২. এলপি ৭০. সুবর্ণ ৪. হারা ২, হীরা ১২, সাগী, শঙ্কায় ৩, এসিআই ২, ছক্কা ও এরাইজ গোল্ড।
সদর উপজেলার বল্লমঝাড় ইউনিয়নের মধুপুর এলাকার কৃষক আঃ সাত্তার ও মোস্তফা মিয়া বলেন, 'আগে আমরা ক্ষতিকর পোকা বুঝতাম না, এখন সহজে শনাক্ত করতে পারছি। এতে কীটনাশকের ব্যবহারও কমেছে। আমাদের এলাকায় এখন আলোক ফাঁদ খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।'
ঝিনাশ্বর এলাকার কৃষক মঞ্জু মিয়া (৫২) বলেন, কৃষি অফিসারের সহায়তায় ফাঁদ বানিয়ে পোকা দমনে সফল হয়েছি। এখন কম পরিমাণ কীটনাশক ব্যবহার করেই ভালো ফল পাচ্ছি।
সদর উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ইদ্রিস আলী ও সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, 'আমাদের ব্লকের বেশ কয়েকটি জমিতে আলোক ফাঁদ বসানো হয়েছে। এতে ক্ষতিকর পোকা চিহ্নিত করে কৃষকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। এটি পরিবেশবান্ধব ও কার্যকর পদ্ধতি।'
গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) রোস্তম আলী ভোরের আকাশকে বলেন, আলোক ফাঁদ ফসলের ক্ষতিকর পোকা মাকড় সনাক্তকরণ, তাদের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব উপায়ে দমনের একটি অত্যন্ত কার্যকর ও জনপ্রিয় যান্ত্রিক পদ্ধতি।সাধারণত সন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত আলোক ফাঁদ চালু রাখা হয়। ফসলের খেতের পাশে ১০০ মিটার দুরে যেখানে পোকার আক্রমণ বেশি, এমন স্থানে এটি স্থাপন করতে হবে। একটি বৈদ্যুতিক বাল্ব বা হারিকেন/হ্যাজাক বাতির নিচে একটি গামলা বা পাত্র রাখতে হবে। গামলায় পানি ভর্তি করে তার সাথে ডিটারজেন্ট পাউডার, সাবানের গুঁড়া বা সামান্য কেরোসিন মিশিয়ে দিতে হবে। বাতিটি ফসলের উপরিভাগ থেকে প্রায় ১-১.৫ ফুট উঁচুতে ঝুলাতে হবে। বাতির আলোতে আকৃষ্ট হয়ে পোকাগুলো পাত্রের পানিতে পড়ে এবং সাবান বা কেরোসিনের কারণে মারা যায়।
তিনি আরো বলেন, মাজরা পোকা,পাতা মোড়ানো পোকা,বাদামি গাছ ফড়িং,কাটুই পোকা, সবজির পোকা আকৃষ্টি হয়। এটি একটি পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি। আলোক ফাঁদে পোকার ধরন ও সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে দমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়। নিয়মিত আলোক ফাঁদ ব্যবহারে রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার ৬০-৭০% পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
ভোরের আকাশ/আ.র