ব্যর্থতাকে পেছনে ফেলে মাছের রেণু উৎপাদনে সফল তরুণ উদ্যোক্তা

একসময় ব্যর্থতার তিক্ত অভিজ্ঞতা ছিল সঙ্গী। তবে সেই ব্যর্থতাকে পেছনে ফেলে প্রশিক্ষণ, কঠোর পরিশ্রম ও অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে পুঁজি করে গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরে আধুনিক পদ্ধতিতে মাছের রেণু উৎপাদনে সফলতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তরুণ উদ্যোক্তা হামিদুর রহমান। তার উৎপাদিত মানসম্মত মাছের রেণু এখন শুধু স্থানীয় চাহিদাই পূরণ করছে না, সরবরাহ হচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলাতেও।
হামিদুর রহমান গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার ফরিদপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ ফরিদপুর গ্রামের বাসিন্দা। শখের বশে ২০০৯ সালে মাছ চাষ শুরু করেন তিনি। কিন্তু উন্নতমানের মাছের রেণু সংগ্রহ করতে তাকে নিয়মিত দূর-দূরান্তে যেতে হতো। এতে সময়, শ্রম ও অর্থ সবকিছুরই অপচয় হতো। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই নিজ এলাকায় মাছের রেণু উৎপাদনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন।
স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০১৬ সালে প্রথমবার একটি হ্যাচারি স্থাপনের উদ্যোগ নেন তিনি। তবে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা ও কারিগরি জ্ঞানের অভাবে সে উদ্যোগ সফল হয়নি। কিন্তু ব্যর্থতায় ভেঙে না পড়ে আরও প্রস্তুতি নেন। ২০১৯ সালে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে তিন মাসব্যাপী মৎস্য বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ থেকে অর্জিত জ্ঞান ও বাস্তব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নতুন উদ্যমে আবারও কাজ শুরু করেন।
বর্তমানে নিজের বাড়ির ২২ শতক জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত ‘দি নিউ চমক মৎস্য হ্যাচারি’ থেকে বাংলা মাছ, ক্যাটফিশসহ প্রায় ১৫ প্রজাতির মাছের রেণু উৎপাদন করছেন হামিদুর রহমান। তার উৎপাদিত রেণুর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। গাইবান্ধার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলার খামারিরাও তার হ্যাচারি থেকে রেণু সংগ্রহ করছেন।
শুধু মাছের রেণু উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নন হামিদুর রহমান। মাছ চাষের পাশাপাশি ছাগল পালন করেও গড়ে তুলেছেন একটি বহুমুখী খামার। এতে যেমন তার আয় বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি স্থানীয় কয়েকজন মানুষের কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
কথা হয় খামারি হামিদুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, 'শুরুর দিকে অনেক বাধা ও ব্যর্থতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু হাল ছাড়িনি। প্রশিক্ষণ নিয়ে নতুনভাবে শুরু করি। এখন আমার উৎপাদিত মাছের রেণু দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে কাজ করতে চাই।'
স্থানীয় বাসিন্দা আশরাফুল আলম জুয়েল বলেন, হামিদুর রহমানের সাফল্য এলাকার তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্রে নতুন করে উৎসাহ জুগিয়েছে। তার উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে মানসম্মত মাছের রেণু সহজলভ্য হওয়ায় মৎস্যচাষিরাও উপকৃত হচ্ছেন।
তরুণ উদ্যোক্তা আকাশ মাহমুদ বলেন, তার খামার দেখে আমার খুবই ভালো লেগেছে। আমারও ইচ্ছা আছে এরকম খামার করার।
এ বিষয়ে গাইবান্ধা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুর রাশেদ বলেন, 'হামিদুর রহমানের হ্যাচারি নিবন্ধনের জন্য আবেদন পাওয়া গেছে। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে দ্রুত পরিদর্শন করা হবে। পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, কারিগরি পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।'
ব্যর্থতাকে সাফল্যে রূপান্তরের এই গল্প প্রমাণ করে সাহস, দক্ষতা অর্জনের আগ্রহ এবং নিরলস পরিশ্রম থাকলে যেকোনো স্বপ্নই বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব। হামিদুর রহমানের এই অর্জন এখন শুধু ব্যক্তিগত সফলতার গল্প নয়; বরং গাইবান্ধার সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
ভোরের আকাশ/এনউব