বন্যা-ভাঙনে চরাঞ্চলে জীবিকার ভরসা গবাদিপশু

প্রতিবছর বন্যা, নদীভাঙন, খরা ও অনিয়মিত আবহাওয়ার কারণে ফসল হারাচ্ছেন কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের কৃষকরা। একসময় কৃষিই ছিল তাদের জীবিকার প্রধান অবলম্বন। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কৃষি ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় বিকল্প জীবিকা হিসেবে গবাদিপশু পালন এখন চরাঞ্চলের মানুষের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে।
গরু-ছাগল লালন-পালনের মাধ্যমে হাজারো পরিবার সংসারের ব্যয় নির্বাহের পাশাপাশি দারিদ্র্য কাটিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। স্থানীয়দের মতে, কৃষির তুলনায় পশুপালনে ঝুঁকি কম এবং প্রয়োজনের সময় গবাদিপশু বিক্রি করে সহজেই অর্থের জোগান দেওয়া যায়।
কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও পরিবেশবিদ মির্জা নাসির উদ্দিন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গত এক দশকে জেলায় বন্যা ও নদীভাঙনের প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে নদীভাঙনে বিপুল পরিমাণ ফসলি জমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ফলে কৃষিনির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, চরাঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গবাদিপশু পালন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সম্প্রতি সদর উপজেলার ঝুনকার চরে খামারি ওসমান গনীর খামার পরিদর্শন করেন জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান। এ সময় তিনি খামারিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং আধুনিক পশুপালন বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেন।
খামারি ওসমান গনী বলেন, “গরু পালন এখন আমাদের সবচেয়ে লাভজনক কাজ। প্রয়োজনে ঋণ নিলেও গরু বিক্রি করে সহজেই তা পরিশোধ করা যায়। এমনকি গবাদিপশু থাকলে এনজিও থেকেও সহজে ঋণ পাওয়া যায়।”
তিনি জানান, একটি গরুর বাছুর এক বছর লালন-পালনের পর ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি করা সম্ভব। এতে একটি পরিবারের উল্লেখযোগ্য সঞ্চয় গড়ে ওঠে এবং সংসারের প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানো সহজ হয়।
জেলার বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার (এনজিও) তথ্য অনুযায়ী, খামারিদের জন্য পশুবীমা সুবিধার পাশাপাশি ১২ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়া হচ্ছে। কোনো বীমাকৃত পশুর মৃত্যু বা ক্ষতি হলে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী ক্ষতিপূরণও দেওয়া হয়, যা খামারিদের আর্থিক ঝুঁকি কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কুড়িগ্রামে বর্তমানে প্রায় ৯ লাখ ২৩ হাজার গরু, ১১ হাজার মহিষ, ৭ লাখ ৪৫ হাজার ছাগল, ১ লাখ ৪৯ হাজার ভেড়া এবং ৩ হাজার ২১৬টি ঘোড়া রয়েছে। এসব গবাদিপশুর বড় একটি অংশ চরাঞ্চলের পরিবারগুলো লালন-পালন করছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, “জেলার প্রায় ৬০ শতাংশ গবাদিপশু চরাঞ্চলে পালন করা হয়। বছরের অধিকাংশ সময় খোলা মাঠে চরিয়ে এসব পশু লালন-পালন করেন খামারিরা। গবাদিপশু পালন শুধু পরিবারের পুষ্টি নিশ্চিত করছে না, বরং চরাঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক ভিত্তিও শক্তিশালী করছে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কৃষি যত অনিশ্চিত হচ্ছে, বিকল্প জীবিকা হিসেবে গবাদিপশু পালনের গুরুত্ব ততই বাড়ছে। সরকারি সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ, পশুবীমা এবং আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনার সুযোগ আরও সম্প্রসারণ করা গেলে কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে টেকসই জীবিকা ও শক্তিশালী গ্রামীণ অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
ভোরের আকাশ/সু.পা