সাগরে বাড়ছে মৃত জেলিফিশ, নির্দেশ করছে জলবায়ু পরিবর্তন

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে সম্প্রতি বিপুল সংখ্যক মৃত জেলিফিশ ভেসে আসছে। গত এক মাসে লাবণী, সুগন্ধা, কলাতলী, নাজিরারটেক হিমছড়ি ও ইনানী সৈকতের প্রায় দেড় হাজারের বেশি জেলিফিশ তীরে ভেসে এসেছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় পরিবেশ পর্যবেক্ষণ দল ইয়ুথ এনভায়রমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস)।
প্রতিদিন সকালে সৈকতের বালুচরে ছড়িয়ে থাকা নীলচে স্বচ্ছ শরীরের এসব প্ৰাণী দেখে কৌতূহলী হচ্ছেন পর্যটকরা। তবে এটি বিজ্ঞানীরা বলছেন- প্রকৃতির এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা। যা জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব নির্দেশ করছে। সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়ছে, কমছে অক্সিজেন: বাংলাদেশ মহাসাগর গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বোগরি) তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে বঙ্গোপসাগরের পৃষ্ঠতলের গড় তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় ১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ।
এর ফলে সমুদ্রের পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গেছে প্রায় ১৫ শতাংশ। নরমদেহী প্রাণী হিসেবে জেলিফিশের জন্য এটি মারাত্মক। উষ্ণ ও কম অক্সিজেন যুক্ত পানিতে টিকে থাকতে না পেরে তারা ঢেউয়ের সঙ্গে তীরে ভেসে আসে। যাদের অনেকেই তখন মৃত অবস্থায় থাকে।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষক জাহিদুল ইসলাম বলেন, “সমুদ্রের উষ্ণতা ও অক্সিজেন ঘাটতির কারণে জেলিফিশের স্বাভাবিক জীবনচক্র ব্যাহত হচ্ছে। তারা সাগরের গভীরে টিকে থাকতে না পেরে উপকূলে চলে আসে। যা শেষপর্যন্ত মৃত্যুর কারণ হয়।” জলবায়ু পরিবর্তনে বদলে যাচ্ছে সাগরের রাসায়নিক ভারসাম্য বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে সাগরের পানির অম্লত্ব (পিএইচ) ক্রমে বাড়ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, গত দশ বছরে বঙ্গোপসাগরের পিএইচ ৮.১ থেকে নেমে এখন ৭.৮। বৃষ্টির মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলের অতিরিক্ত কার্বনডাই- অক্সাইড পানিতে মিশে গিয়ে এই অম্লতা বাড়াচ্ছে ।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষক তুরাবুর রহমান বলেন,“অম্লত্ব তাপমাত্রা বৃদ্ধি জেলিফিশের প্রজনন কোষ ও শরীরের গঠন ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এতে তারা প্রজননে অক্ষম হচ্ছে এবং বেঁচে থাকার ক্ষমতা হারাচ্ছে।”
মানবসৃষ্ট দূষণের ভয়াবহ প্রভাব : ইয়েস এর প্রধান নির্বাহী জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন সংকেত: এ ব্যাপারে ইব্রাহিম খলিল মামুন বলেন, কক্সবাজার সৈকতে প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০ টন প্লাস্টিক ও রাসায়নিক বর্জ্য জমে। পর্যটকদের ফেলে যাওয়া বোতল, ফোম ও মোড়ক ঢেউয়ের সঙ্গে সমুদ্রে ভেসে গিয়ে সামুদ্রিক প্রাণীদের খাবারের সঙ্গে মিশে যায়। জেলিফিশ প্রজাতি এই বর্জ্যকে খাবার ভেবে গ্রহণ করে এবং তা হজমে ব্যর্থ হয়ে মারা পড়ে। কক্সবাজার মৎস গবেষণা কেন্দ্রের এক কর্মকর্তা জানান, “আমরা প্রায়ই মৃত জেলিফিশের শরীরে প্লাস্টিকের ছোট টুকরো লেগে থাকতে দেখি। এটি দূষণের সরাসরি প্রমাণ। "
প্রাকৃতিক চক্র, নাকি পরিবেশগত অস্বাভাবিকতা : সাধারণত বছরে নির্দিষ্ট সময়ে কিছু জেলিফিশ উপকূলে আসে, যা প্রাকৃতিক চক্রের অংশ। তবে বর্তমানের ব্যাপকতা অস্বাভাবিক। স্থানীয় পরিবেশ সংগঠনগুলোর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রতিমাসে গড়ে ২০০ থেকে ৩০০টি জেলিফিশ তীরে ভেসে আসত। আর ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,০০০ থেকে ১,২০০টি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ প্রবণতা সমুদ্রের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। অতিমাত্রায় মাছ ধরা, প্লাস্টিক বর্জ্য এবং অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন কার্যক্রম এই ভারসাম্য আরও নষ্ট করছে।
ডেটা যা বলছে ডেটা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরের পৃষ্ঠতলের তাপমাত্রা ২৭.৩ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। একই সময়ে সাগরের অম্লত্ব বেড়েছে এবং দূষণও কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৮ সালে সৈকতে ভেসে আসা মৃত জেলিফিশের সংখ্যা ছিল ৩৫০টি, ২০২১ সালে ৮০০টি, আর ২০২৫ সালে তা ছুঁয়েছে দেড় হাজারেরও বেশি। অন্যদিকে কক্সবাজার ও টেকনাফ উপকূলে বার্ষিক প্লাস্টিক বর্জ্য জমার পরিমাণ ২০১৫ সালের ১,২০০ টন থেকে বেড়ে ৩,০০০ টনে পৌঁছেছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই তিনটি প্রবণতা- তাপমাত্রা বৃদ্ধি, দূষণ বৃদ্ধি এবং জেলিফিশ মৃত্যুহার বৃদ্ধির মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
পর্যটন ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি সৈকতে মৃত জেলিফিশের ভিড়ে অনেক পর্যটক আতঙ্কিত। কেউ কেউ অজান্তে জেলিফিশ স্পর্শ করে ত্বকে জ্বালা- পোড়া অনুভব করেছেন। কক্সবাজার জেলা প্রশাসন সতর্কতামূলক ঘোষণা দিয়েছে এবং সৈকতে মৃত জেলিফিশ দ্রুত অপসারণে পরিচ্ছন্নতা টিম নিয়োজিত করেছে।
সমাধান কী হতে পারে পরিবেশবিদদের মতে, এই সংকট মোকাবিলায় কয়েকটি পদক্ষেপ এখনই নেওয়া জরুরি। ১. বঙ্গোপসাগরের তাপমাত্রা ও রাসায়নিক গঠন নিয়ে নিয়মিত গবেষণা ও নজরদারি। ২. সৈকত এলাকায় কঠোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও প্লাস্টিক নিষিদ্ধকরণ। ৩. অনিয়ন্ত্রিত মাছ ধরা ও সামুদ্রিক পরিবেশ ধ্বংসকারী কার্যক্রমে নিয়ন্ত্রণ। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কক্সবাজার শাখার সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকানো সম্ভব নয়। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে দূষণ কমিয়ে অন্তত সামুদ্রিক প্রাণীদের টিকে থাকার সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে।”
কক্সবাজার সৈকতে মৃত জেলিফিশের ভেসে আসা নিছক কোনো প্রাকৃতিক ঘটনা নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তনের দৃশ্যমান প্রতিক্রিয়া। সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, দূষণ এবং মানবসৃষ্ট পরিবেশগত চাপের কারণে বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে একদিন হয়তো জেলিফিশের সঙ্গে হারিয়ে যাবে আমাদের উপকূলের জীববৈচিত্র্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
ভোরের আকাশ/জাআ