মিধিলিতে নিখোঁজ ২৫ জেলে দুই বছরেও ফেরেনি, আজও অপেক্ষায় স্বজনরা

পাথরঘাটার উপকূলীয় জেলে পল্লীতে প্রতিটি পরিবার হারানো প্রিয়জনের জন্য দিনরাত অপেক্ষা করে। বাবা হারানো সন্তান, সন্তান হারানো বাবা, ভাই হারানো বোন—এখানকার প্রতিটি ঘরে নিখোঁজ স্বজনের জন্য বেদনা যেনো শেষ হয় না।
দুই বছর আগে, ২০২৩ সালের ১৭ নভেম্বর বঙ্গোপসাগরে আকস্মিক ঝড়, ঘূর্ণিঝড় মিধিলি আঘাত হানে। সেই ঝড়ে ট্রলার ডুবি হয় এবং পাথরঘাটার ২৫ জন জেলে নিখোঁজ হয়। দুই বছর পার হলেও কেউ ফিরে আসেনি। পরিবারগুলো এখনো প্রতিদিন সেই সাগরের দিকে তাকিয়ে প্রিয়জনের প্রত্যাবর্তনের আশা করে।
রুহিতা গ্রামের কালু মাঝির মেয়ে রাইসা মনির বলেন, বাবা চলে যাওয়ার এক বছর হলো, তবু প্রতিদিন মন কাঁদে। মাঝে মাঝে অজান্তেই বাবার নাম ডাকি, দরজার দিকে ছুটে যাই মনে হয় তিনি আসছেন। দিনগুলো কিভাবে কাটছে, তা কেবল তারা জানে। মা অসুস্থ, ওষুধ কিনতেও সক্ষমতা নেই, তবুও তাকে দেখার দায়িত্ব বহন করতে হয়। তাদের মতো আর কোনো সন্তান যেনো বাবা হারানোর বেদনা না ভোগে।
নিখোঁজ জেলে ইউসুফ আলীর ছোট ভাই ইয়াকুব আলী জানান, ভাই দুই সন্তান রেখে সাগরে গিয়েছিল, কিন্তু আর ফিরে এল না। শিশুদের মুখের দিকে তাকালে চোখের জল ধরে রাখা যায় না। সারাদিন ‘বাবা বাবা’ বলে কান্না করে। অনেক খোঁজাখুঁজি করা হয়েছে, তবু ভাইকে আজও পাওয়া যায়নি। জীবিত আছে নাকি মারা গেছে, তা বোঝা যায় না।
পাথরঘাটা উপকূলীয় জেলে পল্লীর এই আর্তনাদ একক নয়। প্রতিটি পরিবার—বাবা, সন্তান বা ভাই হারিয়ে—এখনও এই কষ্ট নিয়ে জীবন কাটাচ্ছে। উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও গবেষক শফিকুল ইসলাম খোকন বলেন, জেলেদের জীবন-জীবিকা এমন, যে প্রতি সাগরে যাত্রা মানে চিরবিদায় নেওয়ার মতো। পরিবারকে সবসময় তাদের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা নিয়ে বাঁচতে হয়।
উপকূলীয় উন্নয়ন বোর্ড এবং স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু সহায়তা দেওয়া হলেও স্বজনরা বলছেন, যথাযথ নিরাপত্তা, সচেতনতা এবং সাহায্য এখনো পর্যাপ্ত নয়। পাথরঘাটার ১৯৯৩ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত নিখোঁজ জেলেদের তালিকা প্রমাণ করছে, এই সমস্যা দীর্ঘমেয়াদি এবং গভীর।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বলেন, উপকূলীয় জীবন-জীবিকা ও জেলেদের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। নিখোঁজ পরিবারের পাশে থাকার চেষ্টা করা হয়েছে এবং তা চলমান আছে।
ঘূর্ণিঝড় মিধিলি একটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় সাইক্লোন যা বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এটি ২০২৩ সালের উত্তর ভারত মহাসাগরের ঘূর্ণিঝড় মৌসুমের পঞ্চম নামকৃত ঝড়। ১৭ নভেম্বর সকালে এটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপান্তরিত হয়, যার কারণে অন্তত ৭ জন নিহত, ১১৩ জন নিখোঁজ এবং ৭০ জনেরও বেশি আহত হয়। নিখোঁজদের মধ্যে ২৫ জনই পাথরঘাটার জেলে।
উপকূলের মানুষের চোখে প্রতিটি দিন কষ্টের। বাবা, সন্তান বা ভাই না ফেরার ভয়, অজানা ভবিষ্যতের আতঙ্ক, আর সংসার চালানোর চ্যালেঞ্জ—সব মিলিয়ে প্রতিটি নিখোঁজ পরিবার মানবেতর জীবন যাপন করছে। আজও তারা প্রতিদিন সাগরের দিকে তাকিয়ে থাকে, প্রত্যাশা করে—একদিন হয়তো প্রিয়জন ফিরে আসবেন। সেই আশা এখনো বেঁচে আছে, এবং উপকূলীয় মানুষের জীবনে প্রিয়জনের প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষা যেনো নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভোরের আকাশ/তা.কা