ঘুষের টাকা ফেরত চাওয়ায় মা-মেয়ে কারাগারে : বিতর্কের মুখে খালাস

কক্সবাজারের পেকুয়ায় ঘুষের টাকা ফেরত চাইতে গিয়ে পুলিশের মারধরের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন এক মা ও তার কলেজপড়ুয়া মেয়ে। পরে পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগ এনে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাদের এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
তবে বিতর্কের মুখে শনিবার (৭ মার্চ) অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ওই মামলা থেকে তাদের খালাস দিয়েছেন।
খালাস পাওয়ার পর শনিবার রাতে পুলিশি নির্যাতন ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অপব্যবহারের অভিযোগ তুলে নিজেদের অভিজ্ঞতা গণমাধ্যমের কাছে তুলে ধরেন ভুক্তভোগী রেহেনা মোস্তফা রানু (৩৮)।
রেহেনা জানান, তিনি ও তার মেয়ে কলেজছাত্রী জুবাইদা জান্নাতকে (২৩) পেকুয়া থানায় নিয়ে পুলিশ মারধর করে। মারধরের একপর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) থানায় আসেন।
“আমরা ভেবেছিলাম তিনি আমাদের রক্ষা করতে এসেছেন। কিন্তু তিনি আমাদের রক্তাক্ত অবস্থায় দেখেও কিছু না বলে উপরে চলে যান। আমরা অনেক অনুরোধ করেছিলাম আমাদেরকে রক্ষা করার জন্য, কিন্তু তিনি কিছুই শোনেননি,” বলেন রেহেনা।
তিনি আরও জানান, পরে পুলিশ তাদের কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়ার কথা বলে গাড়িতে তোলে। পথে ইফতারের সময় হলে পানির জন্য বারবার অনুরোধ করলেও তাদের কিছু দেওয়া হয়নি।
“তাদের হাতে ইফতারের জন্য ফ্রুটিকা ছিল, কিন্তু আমাদের ইফতার করতেও দেয়নি। পরে হাসপাতালে নেওয়ার কথা বললেও আমাদের কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়,” অভিযোগ করেন তিনি।
রেহেনা বলেন, শারীরিক অবস্থা খারাপ থাকায় প্রথমে কারা কর্তৃপক্ষ তাদের গ্রহণ করতে রাজি হননি। পরে ইউএনওর ফোন পাওয়ার পর কারাগার কর্তৃপক্ষ তাদের গ্রহণ করে।
মুক্তির পর মা ও মেয়ের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। পরে তাদের চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। জুবাইদা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকায় ঠিকমতো কথা বলতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন স্বজনরা।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, জুবাইদার জন্মের পরই তার বাবা–মায়ের বিচ্ছেদ ঘটে। ২০১৩ সালে তার বাবার মৃত্যুর পর পৈতৃক সম্পত্তির অংশ পাওয়ার জন্য চাচা ও ফুফুদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন জুবাইদা। কিন্তু তারা তাকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করেন। পরে এ বিষয়ে তিনি আদালতের শরণাপন্ন হন।
আদালত মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেয় পেকুয়া থানাকে। তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পান থানার এসআই পল্লব। অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদনের খরচের কথা বলে জুবাইদার কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা ঘুষ নেন তিনি। তবে টাকা নেওয়ার পরও অভিযুক্ত আত্মীয়দের প্রভাবিত হয়ে মিথ্যা প্রতিবেদন দেন বলে দাবি করেন জুবাইদা ও তার পরিবার।
এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে গত বুধবার বিকেলে জুবাইদা তার মা রেহেনাকে নিয়ে পেকুয়া থানায় গিয়ে এসআই পল্লবের কাছে ঘুষের টাকা ফেরত চান। এ নিয়ে বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে মা–মেয়েকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ।
পরে পেকুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খাইরুল আলম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুব আলমকে থানায় ডাকেন। তার উপস্থিতিতে পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগ এনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে মা–মেয়েকে এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
তবে রেহেনার দাবি, তাদের সামনে কোনো বিচারিক কার্যক্রম হয়নি এবং সাজা দেওয়ার বিষয়টিও তখন জানানো হয়নি। কক্সবাজার কারাগারে নেওয়ার সময় তারা বিষয়টি জানতে পারেন।
এ বিষয়ে ইউএনও মাহবুব আলম বলেন, “থানার ভেতরে আমার উপস্থিতিতে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেওয়া হয়েছে এবং অভিযুক্তদের সামনে তা ঘোষণা করা হয়েছিল।”
এদিকে ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে। তাদের মতে, পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগ থাকলে ফৌজদারি আইনে নিয়মিত মামলা করে গ্রেপ্তার করা যেত। কিন্তু সেটি না করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেওয়া অস্বাভাবিক।
অনেকে মনে করছেন, ঘুষ নেওয়া ও থানার ভেতরে মা–মেয়েকে নির্যাতনের অভিযোগ আড়াল করতে ভ্রাম্যমাণ আদালত ব্যবহার করা হয়েছে। তারা ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত করে ইউএনও, ওসি ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এ ব্যাপারে জানতে পেকুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খাইরুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
ভোরের আকাশ/আ.র