সেলুনে বাড়ছে ভীড়, বিলুপ্তির পথে টুলে বসা চুলকাটা

মানুষের রুচি পরির্বতনশীল। পরির্বতনের ছোঁয়া, ফ্যাশন এবং আধুনিকতা সমান্তরাল। সময়ের ব্যবধান, আধুনিকতা আর রুচির পরির্বতনে মানুষ হয়ে উঠেছে আরামপ্রিয়। হেয়ার স্টাইল ও দাঁড়ি-গোঁফ ছাঁটার পদ্ধতিতেও এসেছে লক্ষনীয় পরিবর্তন। একটুকরো আয়নার সামনে টুলে বসা চুলকাটা এখন বিলুপ্তি প্রায়। সেলুনে আরাম করে ফ্যান বা এসির নীচে বসে ফোম সেভ বা ট্রিমার দিয়ে চুলকাটা বা দাঁড়ি-গোঁফ ছাঁটার দৃশ্য নতুন নয়। ক্ষুর, কাঁচির ব্যবহার কমেছে।রয়েছে পছন্দের মিউজিকের ব্যবস্থা। ফলে আরাম ও স্বস্তি দুটোই বেড়েছে। তবে গ্রাম-গঞ্জের টুলে বা মোড়ায় বসে চুল দাঁড়ি কাটার দৃশ্য তেমন আর চোখে পরে না। বয়স্ক নরসুন্দররা কাজের অভাবে অন্য পেশা বেছে নিচ্ছেন।
প্রদীপ শীল (৪৫) পেশায় একজন নরসুন্দর বা নাপিত। ২৬ বছর ধরে এই পেশায় যুক্ত আছেন তিনি। অবশ্য বংশক্রমেই এই পেশায় আসা তাঁর। দুই ছেলেকে নিয়ে গ্রামের একখন্ড জমিতে তাঁর বসবাস। কয়েকবছর আগে ক্যান্সার রোগে গত হয়েছেন তাঁর স্ত্রী। ক্যান্সারের চিকিৎসায় খরচ করেছেন প্রায় ৬ লক্ষ টাকা। রোজাগারের টাকা এবং সামান্য জমা-জমি যা ছিল তাই বিক্রি করে চিকিৎসা চালিয়েছেন তিনি। শেষ সম্বল বাড়ীর জায়গাও বিক্রি করেছেন সহধর্মীনির চিকিৎসায়। অন্যের জমিতে ঘড় তুলে মাথা গোঁজার ঠাঁই নিয়েছেন তিনি। স্বপ্ন, দুই ছেলেকে মানুষ করবেন। দুই ছেলে পবিত্র ও দীপ পড়াশুনা করছে। প্রদীপ তাঁর নিজের পেশায় সন্তানদের ভীড়তে দেয়নি। তাঁর স্বপ্ন অন্য ছেলেদের মত তার সন্তানেরাও সুশিক্ষায় নিজেকে আলোকিত করুক। পবিত্র পাশ্ববর্তী রহিম উদ্দীন কলেজ থেকে ডিগ্রি পাশ করেছেন। আর ছোটভাই দীপ কলেজে পড়ছে।
বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার সুদিন গ্রামে বসবাস করেন প্রদীপ। জানালেন জীবনের নানা টানা-পড়েন ও সংগ্রামের কথা। আদমদীঘি বাজারে মেইন রোডের দক্ষিণ পাশে খোলা জায়াগায় বসেন তিনি। অবশ্য প্রতিদিনই তিনি বসেন ওই যায়গায়। একটি বড় ছাতা এবং একটি কাঠের চেয়ার পেতে রাখেন। তাঁর কাছে খদ্দের এলে ব্যাগ থেকে কাঁচি, ক্ষুর, চিরুনি, স্যাভলোন এবং শেভিং ব্রাশ ও ক্রীম বের করেন। শেভ ও চুল ছাঁটাইয়ের পর তা কেমন হয়েছে দেখার জন্য একটি বড় লুকিং গ্লাস (আয়না) ব্যবহার করেন তিনি।
রান্নার কাজ কে করছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘স্ত্রী গত হওয়ার পর থেকে তিন জনের রান্না করতে হয় আমাকে। রান্না শেষে কাজে বের হতে দেরি হয়। ছেলেরা অবশ্য আবার বিয়ে করতে বলে। কিন্তু আমি এখনো তাঁদের কথায় সায় দেইনি। বলেছি, পরে দেখা যাবে।’
তিনি জানান, এই পেশায় রোজগার আগের মত আর হয়না। সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। সবাই এখন আধুনিক সেলুনে চুল-দাঁড়ি ছাঁটাই করে। আগের মতো করে আর বাড়িতে বাড়িতে ডাক পরেনা চুল, দাঁড়ি-গোঁফ কাটার জন্য। এজন্য এই অল্প আয় দিয়ে কোন রকমে সংসার চালতে হয়।’
প্রদীপ বলেন, ‘চুল ছাঁটার জন্য কেউ ৩০ আবার কেউ ৪০ পর্যন্ত দেয়। আর দাঁড়ি কাটার জন্য পাই ১৫-২০ টাকা। এই যুগে কেউ খোলা আকাশের নীচে টুল বা মোড়ায় বসে চুল কাটতে চায় না। মানুষের রুচিতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। তাই বেশিরভাগ লোকজনই সেলুনে চুল কাটায়। তবে বয়স্ক মানুষেরা এখানে আসে। মাঝেমাঝে ছোট শিশু-কিশোরদের চুল কাটার কাজ পাওয়া যায়।’
সুদিন পাল্লা গ্রামের আরেক নরসুন্দর সুশীল চন্দ্র শীল (৬০) জানান, ‘প্রতিহাটে গড়ে ৩৩০-৪০০ টাকার কাজ হয়। এই রোজগার দিয়ে কোনমতে সংসার চালায়। বয়স হয়েছে। আগের মতো চোখেও তেমন ভাল দেখতে পাই না। এজন্য খদ্দের কমে গেছে। এছাড়াও পাশে ময়লার ভাগাড় থেকে দুর্গন্ধ আসার জন্য অনেকেই এখানে আসতে চায় না।’
চকসোনার গ্রামের আরেক নরসুন্দর সামছুল প্রামাণিক জানান, ‘অনেকেই এই পেশা ছেড়েছে। অন্য পেশায় নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে। আমরা বৃদ্ধ হয়েছি। তাই অন্য পেশায় যাওয়া সম্ভব নয়। আগে এখানে ১০-১২ জন নরসুন্দর বসতো। কামায়ও ভাল হতো। কিন্তু এখন প্রতিহাটে হাতেগোনা তিন থেকে চারজন বসছি।’
সাইকেল থেকে পড়ে গিয়ে হাত ভেঙ্গেছে অন্য নরসুন্দর উথরাইল গ্রামের দুলাল মোল্লার। তিনি জানান, ‘গত দুইমাস আগে সাইকেল থেকে পরে গিয়ে হাত ভেঙ্গেছে। সংসারে রয়েছে দুই ছেলে ও তিনমেয়ে। তিন মেয়ের বিয়ে হয়েছে। ছেলে দুটি আলাদা। সংসারে খরচ দেয়না। পাড়া-প্রতিবেশি ও আত্মীদের সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে সংসার চলছে। ডাক্তার বলেছে, আরও একমাস বিশ্রাম নিলে তারপরে কাজ করতে পারবো।’
ভোরের আকাশ/জাআ