চকরিয়ায় বন্যার তাণ্ডবে প্রাণিসম্পদ খাতে ৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকার ক্ষতি

সাম্প্রতিক পাহাড়ি ঢল ও ভয়াবহ বন্যায় কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় প্রাণিসম্পদ খাতে নজিরবিহীন ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
বন্যার পানিতে ভেসে গেছে শত শত খামার, মারা গেছে হাজার হাজার গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি। নষ্ট হয়েছে বিপুল পরিমাণ পশুখাদ্য। পানি নেমে গেলেও কাটেনি খামারিদের দুর্ভোগ। জীবিকার প্রধান অবলম্বন হারিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।
চকরিয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এ দুর্যোগে প্রাণিসম্পদ খাতে প্রায় ৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। বন্যায় মারা গেছে ১২ হাজার ১২৯টি গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫৮৩টি খামার, যার মধ্যে ২৬২টি গবাদিপশুর খামার সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ৩৩০টি পোলট্রি খামার সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে।
এছাড়া বন্যার পানিতে ৫০২ টন দানাদার পশুখাদ্য, ৪৫১ টন খড় এবং ৮০৩ টন ঘাস নষ্ট হয়েছে। ফলে পানি নেমে যাওয়ার পরও খামারিরা তীব্র পশুখাদ্য সংকটে পড়েছেন। অনেকেই বেঁচে থাকা গবাদিপশুর খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খাচ্ছেন।
সরেজমিনে উপজেলার বরইতলী, চিরিংগা, খুটাখালী, হারবাং, সুরাজপুর-মানিকপুর ও ফাঁসিয়াখালীসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ খামারে এখনো স্বাভাবিক অবস্থা ফিরেনি। বন্যার নোংরা পানিতে মজুত রাখা খড়, ভুসি ও মুরগির খাদ্য পচে নষ্ট হয়ে গেছে। বিস্তীর্ণ চারণভূমি এখনো জলাবদ্ধ থাকায় গবাদিপশুর খাদ্যসংকট আরও তীব্র হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের দাবি, শুধু ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করলেই হবে না। দ্রুত আর্থিক সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ, বিনামূল্যে পশুখাদ্য ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা না হলে তাদের পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হবে।
বরইতলী ইউনিয়নের টাইম বাজার এলাকার খামারি নুরুল আলম বলেন, ব্যাংক ঋণ ও চড়া সুদে দাদন নিয়ে খামার গড়ে তুলেছিলাম। কিন্তু এক বন্যাতেই সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে। এখন ঋণের কিস্তি দেওয়া তো দূরের কথা, বেঁচে থাকা গবাদিপশুগুলোকে খাওয়ানোর মতো অবস্থাও নেই।
চিরিংগা ইউনিয়নের সওদাগরঘোনা এলাকার খামারি হাবিব উল্লাহ বলেন, বন্যার পানিতে আমার গরু, হাঁস ও মুরগি মারা গেছে। এগুলোই ছিল পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস। অনেক কষ্ট করে পশুগুলো পালন করেছিলাম। এখন সব হারিয়ে নতুন করে কীভাবে শুরু করব, সেটাই বুঝতে পারছি না।
প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞ রিদুয়ানুল হক বলেন, বন্যা পরবর্তী সময়ে আক্রান্ত এলাকায় গবাদিপশুর মধ্যে খুরারোগ, বাদলাসহ বিভিন্ন পানিবাহিত ও সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে পোলট্রি খামারেও রোগজীবাণু ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়েছে। তাই দ্রুত টিকাদান, চিকিৎসাসেবা এবং খামার জীবাণুমুক্ত করার কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।
চকরিয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের ভেটেরিনারি সার্জন ডা. মোহাম্মদ মোন্তাকিম বিল্লাহ বলেন, সাম্প্রতিক বন্যায় চকরিয়া উপজেলায় গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। তাদের পুনর্বাসন এবং প্রাণিসম্পদের রোগ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
ভোরের আকাশ/রই