শিরোনাম
বিদেশি সহায়তা নয়, বাংলাদেশ এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে নতুন বোর্ড গঠনের উদ্যোগবাংলাদেশে হামের প্রকোপ ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি ও পোলিও প্রাদুর্ভাবের ‘সতর্কতা’শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়লেও কমেছে শিক্ষার্থীবিদেশি ঋণ কমেছে ৪২.৩৪%, ছয় উন্নয়ন সহযোগীর প্রতিশ্রুতি নেইকক্সবাজারে আগুন: ডিএনএ পরীক্ষায় নিহত ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত, এখনো নিখোঁজ ১অনলাইন টিকিটের কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণ কঠিন: রেলমন্ত্রীনিপ্পন ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের নৈশভোজে যোগ দিলেন প্রধানমন্ত্রীবিদেশি সহায়তা নয়, বাংলাদেশ এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে নতুন বোর্ড গঠনের উদ্যোগবাংলাদেশে হামের প্রকোপ ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি ও পোলিও প্রাদুর্ভাবের ‘সতর্কতা’শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়লেও কমেছে শিক্ষার্থীবিদেশি ঋণ কমেছে ৪২.৩৪%, ছয় উন্নয়ন সহযোগীর প্রতিশ্রুতি নেইকক্সবাজারে আগুন: ডিএনএ পরীক্ষায় নিহত ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত, এখনো নিখোঁজ ১অনলাইন টিকিটের কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণ কঠিন: রেলমন্ত্রীনিপ্পন ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের নৈশভোজে যোগ দিলেন প্রধানমন্ত্রী

বিদেশি ফলের আবাদে স্বাবলম্বী হচ্ছেন জীবননগরের কৃষকরা

চুয়াডাঙ্গা (খুলনা) প্রতিনিধি

প্রকাশ : ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১:১৯ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
ছবি- ভোরের আকাশ
ছবি- ভোরের আকাশ

চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলায় বিদেশি ফলের চাষ বদলে দিয়েছে অনেক কৃষকের ভাগ্য। একই সঙ্গে বদলে যাচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্র। একসময় শুধু ইরি-বোরো ও আমন ধানের পাশাপাশি প্রচলিত শাক-সবজি চাষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এখানকার কৃষিকাজ। তবে এখন আধুনিক পদ্ধতিতে নানা জাতের বিদেশি ফলের আবাদ করে কৃষকরা লাখ লাখ টাকা আয় করছেন।

ধানের জমিতে আধুনিক পদ্ধতিতে বিদেশি বিভিন্ন জাতের ফল উৎপাদনে ব্যাপক সাফল্য এখানকার কৃষকদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। দিন দিন কৃষকদের কাছে বিদেশি ফলের চাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে বিদেশি ফলের চাষে তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা।

উপজেলার কৃষকরা এখন অ্যাভোকাডো, রাম্বুটান, লংগান, মাল্টা, ড্রাগন, আনারকলি ও আঙুরের মতো ভিনদেশি ফল চাষ করছেন। প্রায় ১৫ বছর আগে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হওয়া এ আবাদ এখন বাণিজ্যিক রূপ নিয়েছে।

একসময় মনে করা হতো, বাংলাদেশের মাটিতে আঙুর চাষ প্রায় অসম্ভব। কারণ আঙুর ছিল এমন একটি ফল, যা দেশে মূলত আমদানির মাধ্যমে পাওয়া যেত। তবে সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলেছে। উন্নত জাত, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি ও কৃষকদের আগ্রহের কারণে এখন জীবননগরে সফলভাবে আঙুরসহ বিভিন্ন বিদেশি ফলের চাষ হচ্ছে।

স্থানীয় কৃষকদের মতে, উর্বর পলিমাটিতে এসব ফলের চাষে তুলনামূলক খরচ কম, আবার ফলনও ভালো। ফলে বাজারে চাহিদা বাড়ছে ও ভালো দামও পাওয়া যাচ্ছে। জীবননগরে উৎপাদিত এসব ফল রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বড় শহরের ফলের দোকানে সরবরাহ করা হচ্ছে।

জীবননগরে পরীক্ষামূলকভাবে আনারকলি চাষ করে সফলতা পেয়েছেন অনন্তপুর গ্রামের কৃষক আকশেদ আলী। তাঁর বাগানে গাছে গাছে ঝুলছে ফুল ও কাঁচা-পাকা ফল। অল্প খরচে লাভজনক হওয়ায় এ চাষে অন্য কৃষকরাও আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

আকশেদ আলী জানান, দীর্ঘ ১০ বছর ধরে তিনি ড্রাগন ও মাল্টা চাষ করছেন। এরপর ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ইউটিউবে ভিডিও দেখে দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল ও প্যারাগুয়ের আদি ফল আনারকলির চারা সিরাজগঞ্জ থেকে সংগ্রহ করেন। জমি প্রস্তুত করে চারা রোপণের পর নিয়মিত সেচ, সার ও কীটনাশক প্রয়োগসহ পরিচর্যা করতে থাকেন। মাত্র ছয় মাসের মধ্যে গাছে থোকায় থোকায় ফুল আসতে শুরু করে। ফলগুলো সঠিকভাবে ধরে রাখা ও পচন থেকে রক্ষা করতে বাঁশের খুঁটি ও তার দিয়ে মাচা তৈরি করা হয়।

বর্তমানে মাচায় মাচায় ঝুলছে কাঁচা ও পাকা আনারকলি। আগস্টের শুরু থেকে পাকা ফল সংগ্রহ শুরু হয়েছে। এসব ফল ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বাজারজাত করা হচ্ছে।

জীবননগর উপজেলার রাজাপুর গ্রামের তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা সজল আহমেদ ২০১৪ সালে মাত্র ৯ বিঘা পেয়ারা বাগান দিয়ে যাত্রা শুরু করেন। বর্তমানে প্রায় ১৪০ বিঘা জমিতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রজাতির ফলের বাগান গড়ে তুলেছেন তিনি।

তাঁর বাগানে বর্তমানে মরক্কো, পাকিস্তান, আফ্রিকা ও ভিয়েতনাম জাতের মাল্টা রয়েছে ৪০ বিঘা জমিতে। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রজাতির আম রয়েছে ৩৫ বিঘা জমিতে। পাশাপাশি ড্রাগন, কমলা, আঙুর, অ্যাভোকাডোসহ প্রায় ২০০ ধরনের দেশি-বিদেশি ফল রয়েছে তাঁর বাগানে।

সজল আহমেদ বলেন, পেয়ারা চাষে কাঙ্ক্ষিত লাভ না পেয়ে ২০১৪ সালে তিনি মাল্টা চাষে মনোনিবেশ করেন। শুরুতে কিছুটা চ্যালেঞ্জ থাকলেও ধীরে ধীরে বাগানের পরিধি ও ফলন বাড়তে থাকে। বর্তমানে সাধারণ সবুজ মাল্টার পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত ‘ইয়েলো কিং’সহ প্রায় ১০ প্রজাতির দেশি-বিদেশি মাল্টা চাষ করে সফলতা পেয়েছেন তিনি।

তাঁর এ বিশাল কর্মযজ্ঞকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ‘বিসমিল্লাহ নার্সারি ও ফলের বাগান’ নামের কৃষি প্রকল্প। সজলের বাগান দেখতে ও চাষ পদ্ধতি শিখতে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থী ও নতুন উদ্যোক্তারা ভিড় করেন।

উপজেলার উথলী গ্রামের আশরাফুজ্জামান মিলু ২০১০ সাল থেকে ড্রাগন ও মাল্টা চাষ শুরু করেন। বর্তমানে তাঁর ২২ বিঘা জমিতে ড্রাগন, ৬ বিঘা জমিতে মাল্টা ও ১০ বিঘা জমিতে পেয়ারা চাষ রয়েছে।

তিনি বলেন, তাঁরা প্রাকৃতিকভাবে ফল চাষ করছেন। এসব বাগানে ফল বড় করার জন্য কোনো ওষুধ ব্যবহার করা হয় না। এতে ফলের আকার কিছুটা ছোট হচ্ছে ও দামও কম পাওয়া যাচ্ছে।

একই গ্রামের রাজু আহমেদ দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে ফল চাষ করছেন। ২০১০ সালে আপেল কুল চাষের মাধ্যমে তাঁর ফল চাষে হাতেখড়ি। এরপর থাই পেয়ারা, মাল্টা ও ড্রাগন চাষ শুরু করেন তিনি। রাজু আহমেদ বলেন, এক বিঘা জমিতে থাই পেয়ারা চাষ করে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা সম্ভব।

উপজেলার হাসাদাহ গ্রামে বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষ করে সাফল্য পেয়েছেন তরুণ উদ্যোক্তা দুই ভাই আশরাফুল ইসলাম ও তরিকুল ইসলাম। তাঁরা সাড়ে ৩ বিঘা জমিতে প্রায় ৭৫০টি পার্পেল ও বাইকুনুর জাতের আঙুর গাছ লাগিয়েছেন। এরই মধ্যে বাগান থেকে অর্থনৈতিকভাবে লাভের মুখ দেখছেন তাঁরা।

জীবননগর উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ড্রাগন ৬৮৮ হেক্টর, মাল্টা ৩১২ হেক্টর, কমলা ১২০ হেক্টর, শরিফা ১ হেক্টর, আঙুর ৯ হেক্টর, রকমেলন ৬ হেক্টর, আনারকলি ২ হেক্টর, অ্যাভোকাডো ৪ হেক্টর, রাম্বুটান শূন্য দশমিক ১৩ হেক্টর, পেয়ারা ৭৪৮ হেক্টর, আনার শূন্য দশমিক ৫০ হেক্টর ও বারোমাসি কাঁঠাল শূন্য দশমিক ৫০ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জীবননগরের এসব ফলের বাগানের খবর ছড়িয়ে পড়ায় প্রতিদিন আশপাশের গ্রাম ছাড়াও যশোর, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর এমনকি ঢাকা থেকেও মানুষ বাগান দেখতে আসছেন।

বাগান দেখতে আসা স্থানীয় দর্শনার্থী হাসান নিলয় বলেন, এমন ফল আগে শুধু টেলিভিশন ও ইউটিউবে দেখেছেন। এখন গ্রামের কাছেই এসব ফল দেখতে পারছেন। আরেক দর্শনার্থী হাসিবুল ইসলাম বলেন, বিদেশি এসব ফল খেতেও সুস্বাদু ও দেখতেও সুন্দর। তাঁরাও এমন বাগান করার কথা ভাবছেন।

আরও পড়ুন

যৌতুকের দাবিতে স্ত্রী নির্যাতন মামলায় স্বামীর জেল ও জরিমানা

জীবননগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন বলেন, বিদেশি ফল চাষে কৃষকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। কৃষি অফিস থেকে তাঁদের প্রযুক্তিগত সহায়তা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এতে কৃষকদের জন্য নতুন আয়ের পথ তৈরি হবে।

তিনি বলেন, জীবননগরের মাটির বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে বিদেশি ফলের চাষ সফল হচ্ছে। কৃষকরা লাভবান হওয়ায় এ চাষে আগ্রহ আরও বাড়ছে। ধান, পাট ও ভুট্টা চাষের পাশাপাশি বিদেশি ফলের বাণিজ্যিক চাষ কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে। এর মাধ্যমে কৃষকদের আয় বাড়ার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্রও বদলে যাবে। পাশাপাশি বিদেশি ফলের আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে কৃষিকে আরও টেকসই করা সম্ভব হবে।

ভোরের আকাশ/সু.পা

শেয়ার করুন: