দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর আবারো চালু হচ্ছে সিরাজগঞ্জের জাতীয় জুট মিল

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর বর্তমান সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ি সিরাজগঞ্জের জাতীয় জুট মিল (কওমী জুটমিল) পুনরায় চালু হতে যাচ্ছে। তবে মিলটি এবার ‘সিরাজগঞ্জ ফ্যাশন লিমিটেড’ নামে চালু হবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত এই পাটকলটি পুনরায় চালুর জন্য দেশের শিল্প প্রতিষ্ঠান প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের কাছে লিজ দিয়েছে সরকার। ইতিমধ্যে মিল এবং মিলের জায়গা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের কর্মকর্তারা মিলটি পরিদর্শন করেছেন। মিলের সংস্কার কাজ শেষে আগামী তিন মাসের মধ্যে উৎপাদন কাজ শুরু হবে বলে জানা গেছে। ধারাবাহিত ভাবে মিলটিতে ৬ হাজার বেকার নারী পুরুষের কর্মসংস্থান হবে।
এর আগে গত ১১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) সঙ্গে প্রাণ-আরএফএল গ্রুুপের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর পর গত ১৭ আগস্ট মিলটি প্রাণ-আরএফএল গ্রুুপের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
জানা যায়, সিরাজগঞ্জ পৌরসভার রায়পুরে ৭৫ একর জমির ওপর ১৯৬০ সালে নির্মাণ করা হয় কওমি জুট মিলটি। এই মিলকে ঘিরে কর্মসংস্থান হয় প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের। ফলে পরিবর্তন হয় এলাকার আর্থসামাজিক অবস্থার। কিন্তু দুর্নীতি আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতাসহ নানা কারণে লোকসানের মুখে ২০০৭ সালে উৎপাদন বন্ধ হয় কারখানাটি।
মিলটি চালুর দাবিতে আন্দোলনে নামেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। পরে ২০১১ সালে কওমি জুট মিল নতুন নামে (জাতীয় জুট মিল) আবার চালু করা হয়। পরে ২০২০ সালের ১ জুন আবারও মিলটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। সর্বশেষ ২০২২ সালে কুষ্টিয়ার রশিদ গ্রুপ মিলটি ভড়া (লিজ) নিয়ে উৎপাদন শুরু করলেও মাত্র দুই বছরের মাথায় ২০২৪ সালে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও বোনাস বকেয়া রেখেই মিলটি বন্ধ করে চলে যায়। ফলে বেকার হয়ে পড়ে শত শত শ্রমিক কর্মচারি। এঅবস্থায় পাটকলটি পুনরায় চালুর লক্ষ্যে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের কাছে লিজ দিয়েছে সরকার।
জাতীয় জুট মিলের শ্রমিক মকবুল হোসেন বলেন, নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জুটমিলটি চালু করার ঘোষনা দিয়েছিলেন। আমাদের দাবী মিলের দক্ষ শ্রমিক রয়েছে তাদের এখানে নিয়োগ দেওয়া হোক। মিলটি চালু হলে এই অঞ্চলের হাজার হাজার বেকার নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান হবে। এজন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানায়। এছাড়া মিলের শ্রমিকদের কিছু বকেয়া রয়েছে বিগত সময়ের। সেই টাকা পরিশোধ করলে শ্রমিকরা উপকৃত হবেন।
সিরাজগঞ্জ স্বার্থ রক্ষা সংগ্রাম কমিটির নেতা নব কুমার কর্মকার বলেন, এই জুট মিলটি দীর্ঘদিন চালু থাকার পর বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ব্যক্তিমালিকাধীন ভাবে চালু করা হলে টিকেনি। এখন মিলটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে আছে। আমরা এই জুটমিলটি চালুর দাবীতে একাধিকবার আন্দোলন করেছি। সরকার নির্বাচনের আগে বলেছিলো দেশের বন্ধ সবকটি পাটকলই চালু করবে। কিন্তু এখন আমরা জানতে পারছি ব্যক্তিমালিকানাধীন ভাবে মিলটি চালু করা হবে। আমরা মনে করি এটি অবশ্যই অন্যায়। পরিবেশ দুষিত হয় এমন কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান জুট মিলেল ভিতরে করা উচিত নয়। তার পরও আমরা মনে করি মিলটি চালু হলে কিছু মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে।
এ বিষয়ে প্রাণ-আরএফএল গ্রুুপের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ শাহান শাহ আজাদ বলেন, আমাদের উদ্যেশ্য হলো দেশের গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনপদের মানুষ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। দেশের বেকার যুবকরা যেন চাকরী করে খেতে পারে। বাংলাদেশের অনেক মিল-কারখানা আছে যে গুলো বন্ধ রয়েছে। এই এলাকার কিছু নির্দিষ্ট জায়গা ছাড়া চাকরির সুযোগ থাকে না। চাকরির জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে যেতে হয়। আমাদের মূল লক্ষ হলো দেশের তৃণমূলে বেকারদের জন্য চাকরির ব্যবস্থা করা। আমরা অলরেডি ২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছি। আমরা রাজশাহীর মিলটি চালু করেছি। সিরাজগঞ্জের জাতীয় জুট মিলটি চালু করতে যাচ্ছি। এখানে প্রাণ আরএফএলের বিভিন্ন প্রডাক্ট তৈরী হবে। উৎপাদিত এসব পণ্য দেশে-বিদেশে রপ্তানী করা হবে। বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে। মিলটির সংস্কার কাজ চলছে। আশা করি আগামী তিন মাসের মধ্যে মিলটি চালু করতে পারবো।
তিনি আরো বলেন, সিরাজগঞ্জের রায়পুরে জাতীয় জুট মিলসে প্রায় ১৫৭ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। মিলটি চালু হলে পর্যায়ক্রমে ৫-৬ হাজার লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এবং বার্ষিক টার্নওভার প্রায় ৫০০ কোটি টাকা হতে পারে। যা আঞ্চলিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ কারখানাকে উত্তরবঙ্গের সর্ববৃহৎ পরিবেশ বান্ধব শিল্প প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিণত করতে চায় প্রাণ-আরএফএল।
ভোরের আকাশ/ এনউব